বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ও বিকাশ বিশ্ব ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্বাঞ্চলের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট গণরায় দেয়। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সেই রায় অস্বীকার করলে সংঘাত ও রক্তপাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ইচ্ছাকে পদদলিত করার মধ্য দিয়েই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাঙন শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের গণতন্ত্রপ্রীতি ইতিহাসস্বীকৃত। এমনিতেই উপমহাদেশের এই অঞ্চল—বিশেষত ‘বেঙ্গল’—রাজনৈতিকভাবে বরাবরই অগ্রসর ছিল, যার উত্তরাধিকার পূর্ববঙ্গের জনগণের মধ্যেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক–এর বিজয়, ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের নিরঙ্কুশ সাফল্য এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সেই মুসলিম লীগের ভরাডুবি—এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, এ অঞ্চলের মানুষ বারবার ভোটের মাধ্যমে শাসকদের জবাব দিয়েছে। যদি পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকত, তবে হয়তো রাষ্ট্রটির আয়ু কিছুটা দীর্ঘ হতো। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় পাকিস্তানের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরার উদ্দেশ্য একটাই—বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রমাণ দেওয়া। যখনই তাদের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে, তখনই তারা প্রতিরোধে নেমেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই দীর্ঘ নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক রক্তাক্ত প্রতিবাদ।
রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু অধ্যায় সময়ের হিসাবে সংক্ষিপ্ত হলেও রাজনৈতিক অভিঘাতে দীর্ঘস্থায়ী হয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তেমনই একটি অধ্যায়। এই সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি, আবার পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক ম্যান্ডেটও তাদের ছিল না। তবু একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো, গভীর মানবাধিকার সংকট ও রাজনৈতিক আস্থাহীনতার মধ্যে তাদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। ফলে এই সরকারের মূল্যায়নে আবেগ বা দলীয় অবস্থানের চেয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাই অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসন, ভেঙে পড়া নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী শক্তির ওপর চালানো দমন-পীড়ন বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কারাগারে নির্যাতন এবং হাজার হাজার মিথ্যা মামলা ছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এই প্রেক্ষাপটেই জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র একটি ট্রানজিশনাল পর্যায়ে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Juan Linz ও Alfred Stepan দেখিয়েছেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার শুরুতেই অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়, যেখানে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ভাঙন ঠেকানো ও ন্যূনতম শাসনযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা।
ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই বহুমাত্রিক অস্থিরতা এই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। যৌক্তিক সংস্কার দাবির পাশাপাশি সুযোগসন্ধানী আন্দোলনও দেখা যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ছিল একটি ‘Overloaded transitional state’, যেখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতার তুলনায় সামাজিক প্রত্যাশা অনেক বেশি।
এই অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করে পতিত স্বৈরাচারী শাসকের বিদেশে অবস্থান থেকে উসকানি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা। এর পরিণতিতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ স্বৈরাচারের প্রতীকগুলোর ওপর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এসব ঘটনা একদিকে রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নে জমে থাকা জনরোষের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পতন ঠেকানো। সমাজবিজ্ঞানী Max Weber রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকারের মাধ্যমে। সেই বৈধতা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব না হলেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও অধ্যাপক আলী রীয়াজ–এর নেতৃত্বে এই কমিশনের লক্ষ্য ছিল বিভক্ত সমাজে ন্যূনতম জাতীয় সমঝোতা তৈরি করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Arend Lijphart দেখিয়েছেন, বহুধাবিভক্ত সমাজে স্থিতিশীলতা আসে সমঝোতা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির মাধ্যমে।
বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার সংস্কারে একাধিক কমিশন গঠন করা হয়। যদিও সব সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, তবু এগুলো ভবিষ্যৎ সংস্কারের নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক তাত্ত্বিক Douglass North–এর ভাষায়, প্রতিষ্ঠানই সমাজের ‘খেলার নিয়ম’।
জুলাই সনদ এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় দলিল। এটি কেবল রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং অতীত ফ্যাসিস্ট শাসনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে একটি ‘Never Again’ ঘোষণা। এই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
তবে সীমাবদ্ধতাও ছিল। কাঠামোগত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতে দুর্বলতা স্পষ্ট। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Samuel P. Huntington যেমন বলেছেন—রাজনৈতিক উন্নয়নের মূল প্রশ্ন সরকারের সক্ষমতা।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ছিল একটি ইতিবাচক দিক। যদিও মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি, এসব ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার উত্তরাধিকার।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এককভাবে সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন। এটি ছিল একটি সেতুবন্ধ সরকার, যার প্রধান অবদান রাষ্ট্রের পতন ঠেকানো ও সংস্কারের দরজা খুলে দেওয়া। রাজনৈতিক দার্শনিক Edmund Burke–এর ভাষায়, পরিবর্তনের সক্ষমতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। এখন প্রশ্ন—ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই পরিবর্তনের পথ কতদূর এগিয়ে নিতে পারবে।







