ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সমন্বয় জোরদারের তাগিদ শিক্ষামন্ত্রীর
দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বা লিংকেজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পরপরই শিক্ষার্থীরা যেন কর্মসংস্থানে প্রবেশের সুযোগ পান, সে জন্য শিল্প খাত ও অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটিং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (এমএএ) ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) আয়োজনে বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও দক্ষতা বাংলাদেশের অন্যতম বড় সম্পদ। বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে শিক্ষার ধরন ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। তাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে ধরনের কার্যকর যোগাযোগ থাকা দরকার, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ এবং চীনে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা যায়। সেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ পান এবং প্রশিক্ষণ শেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই চাকরির সুযোগ তৈরি হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারবে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাত—উভয়ই লাভবান হবে এবং এর সুফল দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে।
নিজের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সময় ও চাহিদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে বিদেশে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিংয়ে এমবিএ করেছেন। এরপর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়নেও কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে কারিগরি, কর্মমুখী ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু প্রচলিত শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এবং প্রায় ৪০০ নটিক্যাল মাইল মহীসোপান রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা বিভিন্ন খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালেই বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনার বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন। বর্তমানে বিশ্বে এ ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ‘ব্লু ইকোনমি’ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক অর্জনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে তিনি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি থাকাকালে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও এলাকা অ্যাসোসিয়েশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি। একইভাবে অ্যালামনাইদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন।
৯০ শিক্ষার্থী পেলেন ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকার বৃত্তি
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের ৯০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে মোট ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ‘এমজিআই-এমএএ বৃত্তি’ দেওয়া হয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থী ২৪ হাজার টাকা করে বৃত্তি পেয়েছেন।
‘এমজিআই-এমএএ স্কলারশিপ’ নামে গঠিত এক কোটি টাকার স্থায়ী তহবিল থেকে এই বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটিং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ যৌথভাবে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় উৎসাহ দেওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার জন্য অ্যালামনাই ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।