গঙ্গার পানিবণ্টনে নবায়ন নয়, নতুন চুক্তি চায় বাংলাদেশ
গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি শুধু নবায়ন না করে নতুন করে চুক্তি করার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি কার্যকর নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি ক্লজ রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীতে নদী নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে বক্তব্য দেওয়ার সময় পানিসম্পদমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে মেয়াদ শেষে চুক্তিটি আগের মতো নবায়ন করা হবে, নাকি নতুন কোনো কাঠামোয় দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হবে—এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন চুক্তির কথা জানালেন পানিসম্পদমন্ত্রী।
শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু পুরোনো চুক্তি নবায়ন করা নয়। বরং দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চায় বাংলাদেশ। সেখানে এমন কিছু নিশ্চয়তা থাকতে হবে, যাতে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও সংশ্লিষ্ট স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত থাকে।
তিনি বলেন, নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গঙ্গার পানিবণ্টন বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নদীর পানিপ্রবাহের সঙ্গে দেশের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক সম্পর্কিত। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিপ্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে।
সংলাপে দেশের নদীগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি নদী। দেশের অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ ও পরিবেশের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু শিল্পায়নের প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীগুলো বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়ছে।
নদী দূষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু দূষণের প্রভাব নিয়ে আলোচনা না করে এর মূল কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। দূষণের উৎস শনাক্ত করা গেলে নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
রাজধানী ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি চিত্রও তুলে ধরেন পানিসম্পদমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মিলিয়ন লিটার বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন লিটার বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
নদীতে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যাওয়ার কারণে পরিবেশের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে বাংলাদেশকে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে নদী দূষণ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্পবর্জ্য, নগর বর্জ্য ও অন্যান্য দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানির গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নদী রক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে মন্ত্রীর বক্তব্যে। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা ও সমঝোতার প্রেক্ষাপটে চলতি বছর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন চুক্তি হলে সেখানে কী ধরনের শর্ত থাকবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে পরবর্তী আলোচনায় বিষয়গুলো সামনে আসবে।
পানিসম্পদমন্ত্রীর বক্তব্যে একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা ও দেশের অভ্যন্তরীণ নদী দূষণ—দুই বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে গঙ্গার পানিবণ্টনে বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য নতুন চুক্তির কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে দেশের নদীগুলোকে দূষণ থেকে রক্ষায় দূষণের উৎস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।