ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি: আব্দুস সালাম মোল্লা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে বিতর্কিত ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক মোল্লাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঠানো নোটিশে ওই বক্তব্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে চেয়ারম্যানকে নোটিশের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন স্বাক্ষরিত নোটিশটি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের কাছে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ইউএনও দবির উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামকে ‘অস্ত্র বানান, মার্ডার হলে আমি দেখব’—এ ধরনের বক্তব্য দিতে দেখা ও শোনা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
শোকজ নোটিশে বলা হয়েছে, ভিডিওতে চেয়ারম্যানের দেওয়া বক্তব্য স্থানীয় পর্যায়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনের বিবেচনায় এ ধরনের বক্তব্য স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪(৪)(খ) ধারায় পরিষদ বা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ এবং অসদাচরণের আওতায় পড়তে পারে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা নোটিশের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়েছে।
নোটিশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। চেয়ারম্যানের জবাব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, সালথার যদুনন্দী ইউনিয়নের উজিরপুর বাজারে নিজ সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। পরে তার বক্তব্যের প্রায় ১০ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে চেয়ারম্যানকে বলতে শোনা যায়, কোনো কিছু করতে হলে তাদের না জানিয়ে করলে তার দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। অন্যদিকে তাদের নেতৃত্বে কোনো ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার তারা নেবেন—এমন বক্তব্যও দিতে শোনা যায়।
ভিডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘দুইটা মার্ডার হোক বা পাঁচটা, সেই দায়ভার আমাদের।’ পাশাপাশি তিনি সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং ‘যার যার অস্ত্র বানাতে হবে’—এমন বক্তব্য দেন। তাদের নির্দেশ ২৪ ঘণ্টা সমর্থকদের সঙ্গে থাকবে বলেও ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়।
এ ছাড়া উজিরপুরবাসী কোনো পরিস্থিতিতে অন্তত ২০ মিনিট প্রতিরোধ করতে পারলে পাশের ২০টি গ্রাম থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী লোক পাঠানোর কথাও ভিডিওতে বলতে শোনা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে গত বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এর আগে নোটিশ পাওয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তার বক্তব্য যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, সেটি মূলত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত একটি সভা ছিল। বোয়ালমারীর ময়েনদিয়া বাজারকে কেন্দ্র করে চলমান বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়দের শান্ত থাকার নির্দেশ দেওয়াই তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি জানান।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সালথার যদুনন্দী ইউনিয়ন এবং বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের সীমানায় অবস্থিত ময়েনদিয়া বাজার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে অতীতেও একাধিকবার সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয়ী ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সালথার যদুনন্দী ইউনিয়নের বড় খারদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, প্রায় ২২ বছর বিদেশে থাকার পর ২০২০ সালে তিনি দেশে ফেরেন। এরপর ২০২১ সালের নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা চলমান রয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব মামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এই ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া শোকজ নোটিশে উল্লেখ করা হয়নি।
এখন শোকজের জবাব দেওয়ার পর চেয়ারম্যানের বক্তব্য ও প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই বিষয়টির পরবর্তী কার্যক্রম নির্ভর করছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।