হুতিদের ঘিরে প্রথম পরীক্ষায় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সামনে জটিলতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপকে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চুক্তিটির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ইসলামি সংহতি ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বিষয়টি সামনে থাকলেও প্রথম বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে হুতিদের বিষয়টি আসায় এর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, সদস্যপদ এবং জনমনে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের বরাতে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ, হুতিরা ইয়েমেনের একটি রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী এবং তাদের ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়।
আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বেতুল দোগান-আক্কাস আল-জাজিরাকে বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে প্রথমবারের মতো কার্যকরভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গাজা বা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি হুমকির পরিবর্তে ইসলামি ভূখণ্ড রক্ষার ধারণাকে সামনে আনা হতে পারে।
তবে তার মতে, চুক্তিটির প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ যদি হুতিদের হুমকিকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগের ভাবমূর্তি ও জনমনে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
দোগান-আক্কাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্ভাব্য পদক্ষেপের লক্ষ্য ইসরায়েল বা কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্র না হলেও শেষ পর্যন্ত একটি মুসলিম দেশ বা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষকে কেন্দ্র করে সামরিক অবস্থান তৈরি হতে পারে। এ কারণে বিষয়টি চুক্তির জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
হুতিদের পরিচয় ও আঞ্চলিক সম্পর্কও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ওই বিশেষজ্ঞ। ইয়েমেনের হুতিরা মূলত জায়দি শিয়া মুসলিমদের একটি রাজনৈতিক ও সামরিক আন্দোলন। তাদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
এই বাস্তবতায় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ভবিষ্যৎ সদস্যপদ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন দোগান-আক্কাস। কারণ, চুক্তিটি ভবিষ্যতে অন্যান্য পক্ষের জন্য উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা থাকলে এর প্রথম কার্যকর পদক্ষেপের ধরন নতুন সদস্যদের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
তার ভাষ্য, যদি চুক্তির প্রথম কার্যকর লক্ষ্য হিসেবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গোষ্ঠী সামনে আসে, তাহলে ভবিষ্যতে চুক্তিটি কোন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে গড়ে উঠবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ইরান সম্পর্কিত ভিন্ন ভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থান রয়েছে। ফলে একই বিষয়ে সব সদস্যের অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা সহজ নাও হতে পারে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইসলামি বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি কাঠামো হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এর আওতায় সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে এই কাঠামো প্রথমবার কার্যকর হলে এর রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং বাস্তবে এর প্রথম কার্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা ভবিষ্যতের গ্রহণযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো পক্ষকে কেন্দ্র করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং জনমতের বিষয়গুলোও বিবেচনায় আসতে পারে।
ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতের সঙ্গে হুতিদের অবস্থান ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতিতে ইরান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের স্বার্থও এই সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে হুতিদের ঘিরে কোনো নতুন সামরিক বা নিরাপত্তা উদ্যোগ শুধু ইয়েমেনের পরিস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রভাবও তৈরি হতে পারে।
এ কারণে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষার ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন অবস্থান, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ এবং চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে কার্যক্রমের সামঞ্জস্য—এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুতিদের ঘিরে সম্ভাব্য পদক্ষেপ চুক্তিটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে। তবে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কোন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে এর পরবর্তী সিদ্ধান্ত, সদস্য দেশগুলোর অবস্থান এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর।
সূত্র: আল-জাজিরা।