জাতিসংঘে বিরল ইতিহাস গড়লেন প্রধানমন্ত্রী
নিউইয়র্ক, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দিয়ে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে নতুন একটি নজির তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে তিনি প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে একই পরিবারের বাবা, মা ও ছেলে—তিনজন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা বিরল। তারেক রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে তাঁর পরিবারের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততায় নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে।
বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং দেশের স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন।
বাবার পর মায়ের ভাষণ, এবার ছেলে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তারেক রহমানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁর পরিবারের তিন সদস্যের ধারাবাহিকতা পূর্ণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। ওই বক্তব্যে তিনি বিশ্বের ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা বৈষম্য, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
জিয়াউর রহমান তাঁর বক্তব্যে শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এর ১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তারেক রহমানের মা ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
জাতিসংঘের নথিপত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে খালেদা জিয়া মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সভায়ও তিনি বক্তব্য দেন। ২০০২ সালে শিশু বিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে জাতিসংঘের ৬০তম অধিবেশন চলাকালীন দুটি পৃথক সভায়ও তাঁর অংশগ্রহণ ও বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে।
বাংলায় প্রথম ভাষণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতে জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ার কথা জানান। তিনি তাঁর বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর বাবা ও মা যেভাবে দেশের জনগণের স্বার্থের কথা তুলে ধরেছিলেন, তিনিও একইভাবে বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের স্বার্থের কথা বলতে জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি একই সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকার তুলে ধরেন
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকারের বিষয় উঠে আসে। জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক সংকট এবং রোহিঙ্গা সমস্যাকে তিনি গুরুত্ব দেন।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো তাঁর বক্তব্যে স্থান পায়।
বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। পারস্পরিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
চার দশকের বেশি সময়ের সম্পৃক্ততা
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণের মধ্য দিয়ে তাঁর পরিবারের সঙ্গে এই বিশ্ব সংস্থার সাধারণ পরিষদের চার দশকের বেশি সময়ের সম্পৃক্ততায় নতুন সংযোজন হলো।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই ধারার সূচনা হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার প্রথম সাধারণ পরিষদে বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অধিবেশনে তাঁর অংশগ্রহণের পর এবার একই মঞ্চে বক্তব্য দিলেন পরিবারের তৃতীয় সদস্য তারেক রহমান।
এবারের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাকে প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে দেশের মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অবস্থান ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো মাতৃভাষায় তুলে ধরার একটি বিশেষ দিকও তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মানুষের প্রত্যাশা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, উন্নয়ন, শান্তি ও মানবিক সংকটের বিষয় তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের জাতিসংঘ-সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতাও নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।