বিশ্বজুড়ে টেকসই শান্তিতে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জোর
বিশ্বজুড়ে টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ এবং এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি (ডব্লিউপিএস) ফোকাল পয়েন্টস নেটওয়ার্ক’-এর বার্ষিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব বিষয় তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে ফিলিপাইন, ইতালি ও ইউএন উইমেনের যৌথ উদ্যোগে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক রেজুলেশন ১৩২৫ গ্রহণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার অব্যাহত রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে রেজুলেশন ১৩২৫ গ্রহণ ও সমর্থনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক কার্যক্রমে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিষয়গুলোকে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও অপরাধের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রতিনিধি। তাঁর বক্তব্যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নারীদের শুধু ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, বাংলাদেশ নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক দ্বিতীয় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বা ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এই কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান ও কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।
বৈঠকে নারীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল হয়রানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর সহিংসতার বিষয়টিও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এসব নতুন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নেতৃত্বাধীন ‘ঢাকা ডায়ালগ’ উদ্যোগের কথা তিনি উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক হয়রানি ও সহিংসতার নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া আসন্ন ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস’-এ যোগ দেওয়ার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আমন্ত্রণ জানান শামা ওবায়েদ ইসলাম। নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক বৈশ্বিক উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ ধরনের প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক রেজুলেশন ১৩২৫ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বকে শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে বিবেচিত। এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা রেজুলেশনটির বাস্তবায়ন, অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, মানবিক সংকট, ডিজিটাল হয়রানি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার মতো পরিবর্তিত বাস্তবতায় নারীর নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে।