মক্কা চুক্তি রক্ষায় সৌদি-পাকিস্তানের অঙ্গীকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। বৈঠকে দুই দেশ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত বৈঠকে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে ইসহাক দার সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি পাকিস্তানের পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে চালানো হামলার নিন্দা জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর প্রভাব হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা ও হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির সামরিক স্থাপনা, বেসামরিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব হামলার সঙ্গে তেহরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে নিউইয়র্কের বৈঠকে। দুই দেশের কর্মকর্তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
এর আগে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পরে চলতি বছরের আগস্টে তুরস্ককে যুক্ত করে চুক্তিটিকে ত্রিপক্ষীয় কাঠামোতে রূপ দেওয়া হয়। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’।
চুক্তিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর আওতাভুক্ত কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশও সেই নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
নিউইয়র্কে ইসহাক দার ও ফয়সাল বিন ফারহানের বৈঠকে এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। দুই পক্ষ চুক্তির আওতায় সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে।
সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিদ্যমান। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এই সহযোগিতা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
বৈঠকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং দেশটির সার্বভৌমত্বের বিষয়েও পাকিস্তানের সমর্থনের কথা জানানো হয়। সৌদি পক্ষও দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নিউইয়র্কের বৈঠকের মাধ্যমে সৌদি আরব ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় এই চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ ও এর প্রভাব আগামী দিনে কীভাবে বিকশিত হয়, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। বর্তমানে সৌদি আরব ও পাকিস্তান উভয় দেশই পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সূত্র: টিআরটি