র্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছিলাম, নাম বদলে একই বাহিনী নয়: শফিকুর রহমান
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, র্যাবের নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠন করা হলে জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ নিয়ে আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। বিকাল ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিলটি স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বিবেচনার জন্য সংসদে উপস্থাপনের পর এর ওপর বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি সরাসরি বলেন, বিলটি বর্তমান অধিবেশনে পাস না করে আরও পর্যালোচনা করা উচিত।
র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন
শফিকুর রহমান বলেন, র্যাবের কার্যক্রম নিয়ে দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা একেবারে ইতিবাচক নয়। বাহিনীটির কিছু ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও বিভিন্ন সময়ে এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠায় দেশ-বিদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
র্যাবের হাতে নির্যাতন, গুম ও মৃত্যুর অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সংসদে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যারা কোনো না কোনোভাবে বাহিনীটির কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, আবার অনেকে গুমের পর দীর্ঘদিন নিখোঁজ ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের গুমের ঘটনা এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগমের স্বামীর প্রসঙ্গও বক্তব্যে তুলে ধরেন। এসব ঘটনার উল্লেখ করে তিনি র্যাবের কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
শুধু নাম পরিবর্তনে সমাধান হবে না
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি বিভিন্ন সময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল থেকে এসেছে। কিন্তু র্যাব বিলুপ্ত করে একই কাঠামো, জনবল ও অবকাঠামো রেখে নতুন নামে বাহিনী গঠনের দাবি কেউ করেনি।
তার অভিযোগ, প্রস্তাবিত এসআরবির ক্ষেত্রে র্যাবের বিদ্যমান কাঠামোর বড় অংশ অপরিবর্তিত থাকছে। স্থাপনা, লজিস্টিক সুবিধা ও জনবল একই রেখে শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তন করা হলে সেটি প্রকৃত সংস্কার হবে না বলে তিনি মনে করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ এমন পরিবর্তন চায় না। একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি তার কার্যপদ্ধতি, জবাবদিহিতা ও আইনগত কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
পুরান ঢাকার ঘটনার প্রসঙ্গ
বিলটি নিয়ে আলোচনা চলার সময় পুরান ঢাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথাও সংসদে তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীর বাসায় তাকে আটক বা নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি বাহিনীর সদস্যরা গিয়েছিলেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
সেখানে প্রয়োজনীয় সার্চ ওয়ারেন্ট ছিল কি না—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে না গেলে ওই নারীকে নিয়ে যাওয়া হতে পারত বলেও তিনি দাবি করেন।
তার ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো অপরাধ করেছেন কি না, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মধ্যে কী বার্তা তৈরি করছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
‘র্যাবের হাতে বিএনপি সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত’
র্যাব প্রতিষ্ঠার সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বক্তব্যে তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, র্যাব গঠনের সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে লুৎফুজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
শফিকুর রহমানের দাবি, পরবর্তী সময়ে র্যাবের কর্মকাণ্ডে বিএনপি সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছে। এরপর জামায়াতসহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে সুশীল সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকেও প্রস্তাবিত নতুন বাহিনী নিয়ে উদ্বেগ ও আপত্তি জানানো হচ্ছে।
বিল পাস না করার আহ্বান
শফিকুর রহমান সরকারকে চলতি অধিবেশনে এসআরবি বিল পাস না করার আহ্বান জানান। তার মতে, আইনটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশেষায়িত কোনো বাহিনী দেশের জন্য প্রয়োজন হলে তার প্রয়োজনীয়তা ও কাঠামো জনগণের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে বাহিনীটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে ঐকমত্য তৈরি করা দরকার।
তার দাবি, বিলটিতে কিছু পরিবর্তন ও নতুন বাধ্যবাধকতা যুক্ত হলেও এর মৌলিক কাঠামোতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে শুধু নাম পরিবর্তন করে নতুন বাহিনী গঠন করলে অতীতের সমস্যাগুলো থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।
সবশেষে তিনি বিলটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। জনগণের মতামত ও বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করে সরকারকে বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করার অনুরোধ করেন তিনি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিলটি নিয়ে বিরোধী দল সাতটি আপত্তি জানিয়েছিল। বৃহস্পতিবার সংসদে সেই আপত্তির ধারাবাহিকতায় বিরোধীদলীয় নেতা বিলটির বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।