ঢাকা: বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার আমদানি আরও বাড়াতে ইন্দোনেশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গভীর, বিস্তৃত ও বহুমুখী করতে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতি সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তাদের মধ্যে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন তারা।
বৈঠকের শুরুতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য ও সেবার জন্য ইন্দোনেশিয়ার বাজারে আরও সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে সিইপিএ নিয়ে এগিয়ে যেতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। এ ধরনের একটি চুক্তি দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি ইন্দোনেশিয়াকে বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানান। বিশেষ করে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের জন্য ইন্দোনেশিয়ার বাজারে আরও সুযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
জবাবে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতি বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে তার দেশের সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য ইন্দোনেশিয়ায় রফতানি বৃদ্ধির বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ইন্দোনেশিয়ার ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার অনুরোধ জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ভ্রমণ ও ভিসা ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সহজ ভিসা ব্যবস্থা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। দুই দেশের নাগরিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার জন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে যৌথ উদ্যোগ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন দুই পক্ষ।
এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়েও মতবিনিময় হয়। দুই দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া উভয় দেশই বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির।
তিনি দুর্যোগ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় উভয় দেশের জন্য উপকারী হতে পারে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ ক্ষেত্রে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, উত্তম চর্চা ভাগাভাগি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈঠকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, সে বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার সমর্থন চাওয়া হয়।
পাশাপাশি রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের উদ্যোগেও ইন্দোনেশিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
বাংলাদেশের এসব উদ্যোগের প্রতি অব্যাহত সমর্থনের কথা জানান ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকে কনস্যুলার বিষয় এবং দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময় নিয়েও আলোচনা হয়। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার জন্য ইন্দোনেশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো গেলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে সিইপিএ, বিনিয়োগ, জ্বালানি, পর্যটন, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করে তুলতে পারে।