সালথায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গোয়ালঘরে বসবাস, ঘরের আশ্বাস ইউএনওর
ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি: আব্দুস সালাম মোল্লা
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর গ্রামের সোহেলের সংসার চলছে চরম দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। নিজের নামে এক শতাংশ জমিও নেই, নেই বসবাসের উপযোগী কোনো ঘর। গরু রাখার জন্য তৈরি করা ছোট্ট একটি গোয়ালঘরই এখন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর পরিবারের একমাত্র আশ্রয়স্থল।
অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ওই ঘরের এক পাশে রাখা হয়েছে সামান্য কিছু গৃহস্থালি সামগ্রী। অন্য পাশে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাত কাটান সোহেল। সীমিত জায়গা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর অভাব-অনটনের মধ্যেই দিনের পর দিন বসবাস করছে পরিবারটি।
শুধু বাসস্থানের সংকটই নয়, পরিবারের উপার্জনের পথও প্রায় বন্ধ। অসুস্থতার কারণে সোহেল নিয়মিত কোনো কাজ করতে পারেন না। তাঁর স্ত্রীও দীর্ঘদিন ধরে দুই কিডনির জটিলতায় অসুস্থ। চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই। একসময় স্ত্রী ভিক্ষা করে সংসারে সামান্য সহযোগিতা করতেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন সেটিও করতে পারছেন না।
ফলে পরিবারটির সামনে একসঙ্গে দেখা দিয়েছে বাসস্থান, চিকিৎসা ও খাবারের সংকট। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার ব্যয় মেটানো তো তাঁদের কাছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
অভাবের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সোহেলের সন্তানদের ভবিষ্যৎ। পরিবারের বড় ছেলে বয়স মাত্র ১৩ বছর। এই বয়সে তার বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, হাতে থাকার কথা বই-খাতা আর কাঁধে স্কুলব্যাগ। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করেছে। এখন সে একটি দোকানে কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করছে।
অন্যদিকে সোহেলের সাত বছর বয়সী ছোট ছেলে এখনো প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে। তবে দারিদ্র্যের কারণে তার পড়াশোনাও কতদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রাজিয়া বেগম বলেন, পরিবারটির জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাঁদের মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর হলে অন্তত বসবাসের কষ্ট কিছুটা কমবে। পাশাপাশি অসুস্থ সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মাতুব্বর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটিকে এমন দুরবস্থার মধ্যে বসবাস করতে দেখছেন তাঁরা। একটি গোয়ালঘরের মতো ছোট জায়গায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সোহেলের জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টকর। তাঁর মতে, পরিবারটির জন্য একটি ঘরের পাশাপাশি চিকিৎসা ও আয়ের ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন।
পরিবারটির মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি জানতে পেরে গত শুক্রবার বিকেলে আটঘর গ্রামে সোহেলের বসতঘরে যান সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের বসবাসের পরিবেশ সরেজমিনে দেখেন।
পরিবারটির পরিস্থিতি দেখে ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, তাঁদের অবস্থা অত্যন্ত মানবেতর। মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই, পাশাপাশি পরিবারের আয়েরও কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সোহেলের পরিবারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইউএনও। একই সঙ্গে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেওয়ারও চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, একটি ঘর হয়তো অনেক বড় কোনো বিষয় নয়। একটি ছোট দোকান দিয়েও হয়তো পুরো পরিবারের সব সমস্যা সমাধান হবে না। তবে এমন একটি উদ্যোগ সোহেলের পরিবারের জন্য নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে সোহেলের পরিবার অন্তত নিরাপদ একটি আশ্রয় পাবে। পাশাপাশি জীবিকার ব্যবস্থা হলে অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পরিবারটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পেতে পারে।