ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি: স্পিকার
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়। দেশটি জোটটির অংশীদার হওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে গেলেও ব্রিকসে যোগদানের বিষয়ে সরকারের অবস্থান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সোমবার সকালে ভোলা সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন স্পিকার। এ সময় তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং ব্রিকসের সঙ্গে দেশের সম্পৃক্ততার বিষয়েও কথা বলেন।
স্পিকার বলেন, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত মর্যাদা দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক কোনো জোট বা সম্মেলনে একটি দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে জোটটির সঙ্গে অংশীদারত্বের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্রিকসের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করবে, সে বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
ব্রিকস হচ্ছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোট। বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে জোটটির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এ জোটের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গ
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের সংরক্ষণ বা আপত্তির মনোভাব তৈরি হয়েছে।
তবে এ কারণে দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার পক্ষে নন তিনি। স্পিকার বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কিন্তু এই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একতরফা সুবিধা নয়, বরং দুই পক্ষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো আলোচিত। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্পিকার।
জুলাই সনদ ও সংস্কার নিয়ে আলোচনা
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যদি সংস্কারের বিষয়ে একটি কার্যকর ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তাহলে সংসদের আগামী অধিবেশনে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হলে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথ সহজ হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং সাংবিধানিক বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কও রয়েছে। এসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
স্পিকারের বক্তব্যে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি উঠে এসেছে। একদিকে ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে এগোবে, অন্যদিকে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় সামনে রেখে তার বক্তব্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে ব্রিকসের অংশীদারত্বের বিষয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জোটটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়তে থাকায় বাংলাদেশ কীভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে, সেটি পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সোমবার ভোলায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভিত্তি এবং দেশের রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তা।