উত্তর কোরিয়ায় বাড়ছে বিলাসী পণ্যের বাজার, কিমের কৌশল কী
উত্তর কোরিয়া বললেই সাধারণত কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রস্তুতি, সীমিত স্বাধীনতা এবং নানা বিধিনিষেধের চিত্র সামনে আসে। তবে দেশটির রাজধানী পিয়ংইয়ংসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ভোগ ও বিনোদননির্ভর স্থাপনা বাড়ছে। বিলাসবহুল বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ, সৈকতকেন্দ্র, জলকেলি কেন্দ্র, ব্যায়ামাগার এমনকি পোষা প্রাণীর দোকানও চালু হচ্ছে। এর পেছনে দেশটির নেতা কিম জং উনের একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কৌশল কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের বাণিজ্যিক তথ্য, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সম্প্রতি দেশটিতে যাওয়া পর্যটক ও দেশত্যাগীদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
চীনের শুল্কসংক্রান্ত তথ্য বলছে, গত এক দশকে উত্তর কোরিয়ায় বিভিন্ন ধরনের ভোগ্য ও বিনোদনমূলক পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ সময়ে মালিশের সরঞ্জাম আমদানি প্রায় ৪০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি আমদানিও বেড়েছে ৬০০ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে পিয়ানো, হাতঘড়ি এবং বিভিন্ন বিনোদনসামগ্রীর আমদানি বেড়েছে।
এমনকি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে চীন থেকে তিন টনের বেশি ব্যাটারিচালিত বাম্পার কার আমদানি করেছে উত্তর কোরিয়া। এসব তথ্য দেশটির ভোগ ও বিনোদননির্ভর বাজারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পিয়ংইয়ংয়ের বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনাতেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত বছর চালু হওয়া রাংনাং এগুক কুমগাং সার্ভিস কমপ্লেক্সে মানুষ কফি পান করছেন এবং ঘরোয়া ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য কিনছেন। রিউগিয়ং গোল্ডেন প্লাজায় রোলেক্স, ওমেগা ও হারবেলিনের মতো আন্তর্জাতিক ঘড়ির ব্র্যান্ডের নামও দেখা গেছে। পাশাপাশি একটি ইলেকট্রনিকসের দোকানে হুয়াওয়ের নাম রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ায় তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিবেশক বা অনুমোদিত বিক্রেতা নেই।
শুধু কেনাকাটার সুযোগ বাড়ানো নয়, নাগরিকদের বিনোদনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে উত্তর কোরিয়ার সরকার। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে চালু করা হয় ওয়ানসান কালমা সৈকতকেন্দ্র। চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সেখানে তিন লাখের বেশি স্থানীয় পর্যটক গিয়েছেন।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এখন জলকেলি কেন্দ্র, সাঁতারকেন্দ্র, খেলাধুলার স্থান, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠছে। অন্তত দুই ডজন বিনোদনকেন্দ্র ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে অথবা নির্মাণাধীন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল মানুষের অবসর কাটানোর সুযোগ বাড়ানো নয়। বরং নাগরিকদের হাতে থাকা অর্থ অনানুষ্ঠানিক বাজারে ব্যয়ের পরিবর্তে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় নিয়ে আসাই কিম জং উনের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। এর মাধ্যমে সরকার একদিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক বাজারের প্রভাব কমিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার আয় বৃদ্ধির পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি উৎস কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা অংশগ্রহণ এবং কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ রপ্তানি।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকতে পারে।
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুডিগার ফ্রাঙ্কের মতে, উত্তর কোরিয়ায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে। তাদের হাতে অর্থ বা সঞ্চয় থাকলেও ব্যয়ের সুযোগ সীমিত। কিমের ভোগ বাড়ানোর নীতি সেই অর্থকে বাজারে প্রবাহিত করার একটি উপায় হতে পারে। এর ফলে মানুষের অসন্তোষ কিছুটা কমানোর পাশাপাশি চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে নতুন এই ভোগের সুযোগ সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমান নয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসকারী উত্তর কোরিয়ার সাবেক চালক ইয়াং ইল-চেওল বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য নতুন রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ এখনো খুব সীমিত। সরকারের ওপর আস্থার ঘাটতির কারণে অনেকেই ডিজিটাল লেনদেনের পরিবর্তে নগদ অর্থ ব্যবহার করেন।
অধ্যাপক রুডিগার ফ্রাঙ্কের ভাষায়, ভোগ ও বিনোদনের সুযোগ সরকারকে কিছুটা সময় দিতে পারে এবং মানুষের আনুগত্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আনুগত্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ফলে উত্তর কোরিয়ায় বিলাসী পণ্য, বিনোদনকেন্দ্র ও ভোগের সুযোগ বাড়লেও এর প্রকৃত সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কিম জং উনের এই নীতি অর্থনীতিকে কতটা চাঙ্গা করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ভোগের বিস্তার কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা ভবিষ্যতেই স্পষ্ট হবে।
সূত্র: রয়টার্স