জ্বালানি সংকট নিয়ে কথা বললে স্বৈরাচার ফেরার ভয় দেখায় সরকার: জামায়াত আমির
বগুড়া প্রতিনিধি
দেশে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে কথা বললে সরকার ‘স্বৈরাচার ফিরে আসবে’ বলে ভয়ভীতি দেখায় বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ কষ্টে রয়েছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে শিল্প খাতে এ সংকটের প্রভাব বেশি পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে বগুড়া সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
জামায়াত আমির বলেন, দেশে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে তারা সংসদের ভেতরে বিষয়টি তুলে ধরে সংকট সমাধানে সরকারের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। এ জন্য টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, সংসদের ভেতরে বারবার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেও কার্যকর উদ্যোগ না দেখে বিরোধী দলগুলো রাজপথে কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছে। তার ভাষ্য, সময়মতো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বর্তমান পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলি তখন সরকার স্বৈরাচার ফিরে আসবে বলে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায়। অথচ দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।’ বিরোধী দল সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাইলেও সে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের আমির আরও বলেন, সংকটের বিষয়টি সরকার শুরুতে স্বীকার করতে চায়নি। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার প্রভাব অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন চালিয়ে নিতে সমস্যার মুখে পড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার মতে, জ্বালানি সরবরাহের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প উৎপাদন আরও ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব শুধু শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মতবিনিময়কালে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন ও পরিবর্তনের পর জনগণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার প্রত্যাশা করেছিল। সেই সংস্কারের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে তাদের মতামত জানিয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
জামায়াত আমিরের অভিযোগ, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বগুড়ার উন্নয়ন ও শিল্পায়ন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বগুড়া দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। একসময় বগুড়াকে ‘মিনি শিল্পনগরী’ হিসেবে পরিচিত করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জেলার কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও বগুড়ার উন্নয়ন ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা ছিল, তার যথাযথ ব্যবহার হয়নি। জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশের যেখানেই অসংগতি দেখা যাবে, সেখানেই তারা কথা বলবেন। বগুড়ার মানুষের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার বিষয়েও তারা সোচ্চার থাকবেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বগুড়ার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এখানে নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে জেলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বগুড়া মহানগর জামায়াতের আমির আবিদুর রহমান সোহেল, ইফসুর মহাসচিব ড. মোস্তফা ফয়সাল পারভেজসহ স্থানীয় জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় শেষে শফিকুর রহমান বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি শহীদ আব্দুল মালেক ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।
জ্বালানি সংকট, রাজনৈতিক সংস্কার এবং বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। তার বক্তব্যে এসব সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ এবং বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও সামনে এসেছে।