খুলনায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে জুট মিল শ্রমিক নিহত, মাদক সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ
মোঃ আসিফ আমিন, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানাধীন কুলিবাগান মোড় এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে জলিল মুন্সি (৩৫) নামে এক জুট মিল শ্রমিক নিহত হয়েছেন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে প্রকাশ্য সড়কে এ ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলে করে আসা তিন দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো শনিবার সকালে কুলিবাগান মোড় এলাকায় ছিলেন জলিল মুন্সি। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে তিন ব্যক্তি সেখানে আসে। তারা মোটরসাইকেল থেকে নেমে বা অবস্থান করেই জলিলকে লক্ষ্য করে পরপর দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলির একটি তার বুক ও অন্যটি পিঠে লাগে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
হঠাৎ গুলির শব্দে আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামলাকারীরা গুলি চালানোর পর আর কোনো সময় নষ্ট না করে মোটরসাইকেলযোগে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। স্থানীয়রা এগিয়ে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় জলিল মুন্সিকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জলিল মুন্সিকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কুলিবাগান এলাকায় শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। প্রকাশ্য স্থানে এ ধরনের হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নিহত জলিল মুন্সি কুলিবাগান এলাকার দিল মুন্সির ছেলে। তিনি স্থানীয় ইস্পাহানী জুট প্রেসে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কী কারণে তাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ঘটনার খবর পেয়ে দৌলতপুর থানার একটি টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামলাকারীদের ধাওয়া করেন। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে নিহত জলিল মুন্সির মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার অতীত কর্মকাণ্ড, পরিচিতজন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। একই সঙ্গে তার কাছে কোনো পক্ষ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মাদক সংক্রান্ত কোনো লেনদেন, বিরোধ কিংবা পূর্বশত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে এসব এখনো তদন্তাধীন বিষয়। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখছে না পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হামলার ধরন, হামলাকারীদের সংখ্যা, ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং ঘটনার সময় তাদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছ থেকেও ঘটনার বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় থাকা সম্ভাব্য সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেলে তা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হতে পারে।
ঘটনার পর কুলিবাগান মোড় এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও তদন্তকারী দলের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।
পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে জলিল মুন্সিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিহতের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখার পাশাপাশি কারও সঙ্গে তার সাম্প্রতিক বিরোধ ছিল কি না, সে বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে নিহতের মরদেহের বিষয়ে হাসপাতাল ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কার্যক্রম চলছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় যাতে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে।
দৌলতপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আলামতের ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্টতা কিংবা পূর্ববিরোধের যে বিষয়গুলো প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে, সেগুলোর সত্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।
প্রকাশ্য স্থানে একজন জুট মিল শ্রমিককে গুলি করে হত্যার ঘটনায় কুলিবাগান ও আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশের তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।