সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নিশ্চিতের আহ্বান, লেক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
রাজধানীকে পরিকল্পিত, আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তুলতে ভবনে সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল এবং পয়ঃশোধনাগার (STP) স্থাপন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা শুধু পরিবেশ দূষণই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে কার্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর উদ্যোগে গুলশান, বারিধারা, বনানী ও নিকেতন এলাকার বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে রাজধানীর গুলশান সোসাইটি পার্কে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, এমপি; গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, এমপি; এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুর ইসলাম। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান এবং গুলশান, বারিধারা, বনানী ও নিকেতন এলাকার সোসাইটির প্রতিনিধিরা সভায় অংশগ্রহণ করেন।
সভায় বক্তারা বলেন, দ্রুত নগরায়ণের ফলে রাজধানীতে স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ভবনে এখনও প্রয়োজনীয় সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল কিংবা কার্যকর পয়ঃশোধন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এর ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য বিভিন্ন খাল, লেক ও জলাশয়ে গিয়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ভবন মালিক, সরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় গুলশান, বারিধারা, বনানী, নিকেতন এবং হাতিরঝিল এলাকার লেকসমূহের পানি দূষণ রোধের বিষয়টি। বক্তারা বলেন, পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শুধু পরিবেশ নয়, নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশও রক্ষা করা সম্ভব হবে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, এমপি বলেন, টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বার্থে পরিবেশসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সরকার একটি আধুনিক, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে ব্যবহার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, এমপি বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি উন্নত, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজধানীর প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, একটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক না থাকলে সেই ভবনের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা লেক, খাল ও জলাশয় দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
রাজউকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, গত দুই মাসে সংস্থাটি মোট ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন ও বাসা পরিদর্শন করেছে। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫৮৭টি ভবনে সেপটিক ট্যাংক রয়েছে, আর ২ হাজার ৮২২টি ভবনে কোনো সেপটিক ট্যাংক পাওয়া যায়নি। একই সময়ে পরিদর্শনে দেখা গেছে, মাত্র ৩৪১টি ভবনে সোক ওয়েল রয়েছে, অথচ ৪ হাজার ৬৮টি ভবনে সোক ওয়েলের ব্যবস্থা নেই।
তিনি বলেন, এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং রাজধানীর স্যানিটেশন ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৬১ সালের লিজ ডিড অনুযায়ী প্রতিটি প্লটে সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণের ক্ষেত্রেও এ শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবন মালিকদের নিজ দায়িত্বে এসব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, এমপি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে অসচেতনতা এবং নিয়ম না মানার কারণে ভবনের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি লেকে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে রাজধানীর সুয়ারেজ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে সব বর্জ্য নির্দিষ্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এতে লেক ও জলাশয়ের পানি দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে আধুনিক ও কার্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা। রাজউক ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ভবনের স্যানিটেশন অবকাঠামো পরিদর্শন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান কার্যক্রম জোরদার করেছে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ভবন মালিক, সোসাইটি, নাগরিক এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া রাজধানীর স্যানিটেশন ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
সভায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সোসাইটির প্রতিনিধিরা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, নিয়মিত মনিটরিং, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বক্তারা আরও বলেন, সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল এবং আধুনিক পয়ঃশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে গুলশান, বারিধারা, বনানী, নিকেতন ও হাতিরঝিল এলাকার লেকসমূহকে দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। এতে রাজধানীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং নগরীর সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভার শেষে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং ভবন মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে রাজধানীতে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গুলশান, বারিধারা, বনানী, নিকেতন ও হাতিরঝিল এলাকার লেকসমূহ দূষণমুক্ত হয়ে তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফিরে পাবে এবং একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাজধানী গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।