পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিবেশ রক্ষায় বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক পর্যালোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন। সভায় দেশের সামগ্রিক পরিবেশ পরিস্থিতি, দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের চলমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব সামগ্রী ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিবেশ দূষণবিরোধী কার্যক্রমে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। ব্যবহারের পর এসব সামগ্রী সহজে মাটিতে মিশে যায় না। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা প্লাস্টিক ও পলিথিন পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে। এ কারণে এসব পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সভায় পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রচলিত ইটের উৎপাদন ও ব্যবহার পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে বলে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বায়ু, পানি, মাটি ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দূষণের ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু একটি খাত নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। নগর ও বিভিন্ন এলাকায় উৎপন্ন বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেসব বিষয়ও চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়।
পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতিও সভায় পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো কীভাবে দায়িত্ব পালন করছে এবং ইতোমধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরিবেশ রক্ষায় কী ধরনের কার্যক্রম আরও জোরদার করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে মাঠপর্যায়ে তদারকি ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আরও জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবেশ দূষণ রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারের সঙ্গে উৎপাদক, বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সব পক্ষই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. সাইমুম পারভেজসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
সভায় পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং বায়ু, পানি, মাটি ও শব্দদূষণ কমাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ দূষণ কমাতে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। তবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি থাকলে পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কমানো সম্ভব।
সচিবালয়ের এই পর্যালোচনা সভার মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে পলিথিন-প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর অগ্রগতি আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।