ইতালির ভেনিসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় এ অভিযোগ জানান তিনি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দেশের শোবিজ অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
অভিনেত্রী বাঁধনের অভিযোগের পর তার পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীদের অনেকে। পরীমনি, মম, সাফা কবির ও মৌসুমী হামিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনীতির কারণে শিল্পীদের হেনস্তা ও অপমানের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
পরীমনির তীব্র প্রতিক্রিয়া
বাঁধনকে হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিনেত্রী পরীমনি। ভিডিওটির সঙ্গে দেওয়া পোস্টে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পরীমনি লেখেন, ‘বেশি কিছু না। কতগুলা কুকুরের বাচ্চা রাস্তায় ঘেউ ঘেউ করছে। এদের কাছে মানুষের বাচ্চার কান্না কিছুই ম্যাটার করে না। করেও নাই।’
তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাঁধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের ক্ষোভের কথা জানান অভিনেত্রী। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
বাঁধনের পরিবারের পাশে সাফা কবির
অভিনেত্রী সাফা কবিরও বাঁধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, বাঁধন ও তার পরিবার যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাফা কবির বলেন, তিনি ঘটনাটিতে অত্যন্ত মর্মাহত, ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত। তার মতে, কোনো শিল্পীর এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, একজন শিল্পী যখন দেশের বাইরে কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের চলচ্চিত্র এবং নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যান, তখন তার প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা। এর পরিবর্তে অপমান, হয়রানি কিংবা আতঙ্কের মুখোমুখি হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
রাজনীতির টানাপোড়েনে শিল্পীদের টেনে আনার অভিযোগ
সাফা কবিরের বক্তব্যে দেশের শিল্পীদের রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে টেনে আনার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে দেশের শিল্পীদের বারবার কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে জড়িয়ে ফেলা হয়।
তার ভাষ্য, শিল্পীরা সত্য, ন্যায় ও মানুষের কথা বলবেন—এটাই তাদের স্বাধীনতা। কিন্তু কোনো শিল্পী নিজের মত প্রকাশ করার কারণে বারবার কেন মূল্য দেবেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বাঁধনের ঘটনায় সাফা কবির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এই ঘটনার ন্যায়বিচার হওয়া প্রয়োজন। একজন শিল্পীর কণ্ঠ, সম্মান ও নিরাপত্তা কখনোই রাজনীতির মূল্য হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘শিল্পী হওয়াটাও পাপের’—মৌসুমী হামিদ
বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এই দেশে শিল্পি হওয়াটাও পাপের।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, শিল্পীরাই কেন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তার মতে, কোনো শিল্পীর ওপর হামলা বা হেনস্তা কোনোভাবেই কাম্য নয়—ঘটনাটি দেশের ভেতরে হোক কিংবা দেশের বাইরে।
মৌসুমী হামিদ জানান, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল করেননি। তবে দেশের ভালো-মন্দ ও বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে সবসময় কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে শিল্পীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে মানুষ হিসেবে মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
পুরোনো ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন
বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মৌসুমী হামিদ ৩২ নম্বরের একটি পুরোনো ঘটনার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তার বক্তব্য, তখন বাঁধনের নীরব থাকার বিষয়টি যারা সমালোচনা করেছিলেন, তাদের কেউ কেউ এখন নতুন ঘটনার সমর্থন করছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজনের পোশাক টেনে ছিঁড়ে দেওয়ার ঘটনা অন্য একজনের ক্ষেত্রেও একই আচরণকে বৈধ করে দেয় কি না। এ ধরনের রাজনৈতিক অবস্থানকে তিনি সমালোচনা করেন।
মৌসুমী হামিদের মতে, মানুষের নেতা হওয়ার জন্য রাজনীতি হওয়া উচিত; মানুষের পোশাক ছিঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি তৈরি করা কোনোভাবেই নেতৃত্বের পরিচয় হতে পারে না।
বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান ও ভাসানীর উদাহরণ
নিজের বক্তব্যে জাতীয় নেতাদের উদাহরণও টেনেছেন মৌসুমী হামিদ। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও মওলানা ভাসানীর নাম উল্লেখ করে বলেন, তারা নেতা ছিলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষকে তার মনুষ্যত্ব দিয়ে বিচার করার পরিবর্তে রাজনৈতিক দল বা পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, একজন শিল্পীর রাজনৈতিক মত বা অবস্থান যাই হোক না কেন, তার প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিল্পীদের রাজনৈতিক বিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
শোবিজ অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
বাঁধনের অভিযোগ সামনে আসার পর দেশের বিনোদন অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একাধিক শিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। পরীমনি, সাফা কবির ও মৌসুমী হামিদের বক্তব্যে যেমন ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি শিল্পীদের নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এর আগে ইতালিতে বাঁধনের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত ও সত্যতা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষার মধ্যেই শিল্পীরা হেনস্তার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।বাঁদন
বাঁধনের অভিযোগ ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি নতুন করে শিল্পীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।