বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগকে ঘিরে সরকারি অর্থের অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার, উদ্ধারকারী জাহাজের জ্বালানি তেল ব্যবহারে গরমিল এবং ঠিকাদারি কাজে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান করছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে দুদকের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের অধীনে উদ্ধারকারী জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তব ব্যবহারের তুলনায় অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের হিসাব দেখিয়ে বিল করা হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল।
বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ কার্যালয় সূত্র জানায়, ওই অঞ্চলে একসময় ‘প্রত্যয়’ ও ‘নির্ভীক’ নামে দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ দায়িত্ব পালন করত। বর্তমানে ‘নির্ভীক’ বরিশাল অঞ্চলে রয়েছে এবং ‘প্রত্যয়’ নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছে। প্রায় ২৫০ টন উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন ‘প্রত্যয়’ নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে রাখা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জাহাজটির নামে নিয়মিত উদ্ধার অভিযান বা মহড়া পরিচালিত না হলেও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহারের হিসাব দেখিয়ে বিল করা হয়েছে। ফলে জাহাজটির জ্বালানি গ্রহণ, ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
বয়া-বিকন বাতির কাজেও অনিয়মের অভিযোগ
নৌপথের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত বয়া ও বিকন বাতির কাজ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে ‘আঁখি এন্টারপ্রাইজ’, ‘তানিয়া এন্টারপ্রাইজ’, ‘তানজিল ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ ও ‘আলিফ এন্টারপ্রাইজ’-এর নাম এসেছে। কয়েকটি বিলের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৭ লাখ ৭২ হাজার, ৬ লাখ ৮১ হাজার, ৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৫২, ৯ লাখ ৩৬ হাজার, ৮ লাখ ৮৪ হাজার ১০০ এবং ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৫১ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থের বিপরীতে প্রকৃত কাজ হয়েছে কি না, সরবরাহ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে কারা দায়িত্ব পালন করেছেন—তা নথিপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেট এসব কাজে প্রভাব বিস্তার করেছে। ঠিকাদার বাহার নামের এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও অভিযোগে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
অস্বাভাবিক সম্পদের অভিযোগ
সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি মো. আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে তার আয় ও চাকরির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি ও ভবন রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তর মুগদার ‘আলিফ গার্ডেন’-এ প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট এবং একই এলাকার ঝিলপাড় রোডে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। আশুলিয়ার ইসলামনগরে ১০ কাঠা জমির ওপর প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাভারে দুটি বাণিজ্যিক দোকান ও প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের একটি সাততলা ভবন, মোহাম্মদপুর হাউজিং এলাকায় প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের জমি এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আরও সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে।
কেরানীগঞ্জের পশ্চিমপাড়ে ঠিকাদার বাহারের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের একটি ডকইয়ার্ড থাকার অভিযোগও এসেছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
বক্তব্যের জন্য যোগাযোগের চেষ্টা
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিআইডব্লিউটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোনে সাড়া দেননি।
বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন দাপ্তরিক সূত্র জানিয়েছে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’-এর জ্বালানি গ্রহণ ও ব্যবহার রেজিস্টার, লগবুক, উদ্ধার অভিযান ও মহড়ার নথি, বয়া-বিকন বাতি সংক্রান্ত আমদানি ও সরবরাহ কাগজপত্র, ঠিকাদারি বিল, কাজের পরিমাপ বই এবং অর্থ পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দুদক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সরকারি অর্থের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না এবং দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা স্পষ্ট হতে পারে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।