এমপিদের মোবাইলে টাকা চেয়ে এসএমএস, ভয়েস ক্লোন ও স্বাক্ষর জাল নিয়ে সতর্কতা
সংসদ সদস্যদের মোবাইল ফোন হ্যাক করে টাকা দাবি, ভয়েস ক্লোনিং এবং স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণার ঘটনায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ সদস্যদের মোবাইল ফোনে জরুরি প্রয়োজনে টাকা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক বার্তা পাঠানো হচ্ছে। এসব বার্তার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় বিষয়টি তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি তাদের পরিচিতজনদেরও এ ধরনের প্রতারণার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ প্রতারকরা শুধু মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেই থেমে নেই; তারা প্রযুক্তির বিভিন্ন সুবিধা কাজে লাগিয়ে পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর নকল এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র বা স্বাক্ষর জাল করার চেষ্টা করছে।
চিফ হুইপ সংসদে তার নিজের কাছে আসা কয়েকটি প্রতারণামূলক বার্তার বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি জানান, বুধবার কয়েকজন সংসদ সদস্য তাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তাদের মোবাইল ফোনে জরুরি ভিত্তিতে ৫০ হাজার, ৩০ হাজার এবং ২৫ হাজার টাকা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে বার্তা এসেছে। তিনটি আলাদা নম্বর থেকে এ ধরনের বার্তা পাঠানো হয়েছে।
এসব নম্বরে পরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ করা হয়নি বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বরগুলো হ্যাক হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন চিফ হুইপ। তার মতে, সংসদ সদস্যদের পরিচিতি ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকরা এমনভাবে বার্তা পাঠাচ্ছে, যাতে প্রাপকের কাছে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বিষয়টি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। একজন সংসদ সদস্যের মোবাইল ফোন বা পরিচিতির অপব্যবহার করে তার আত্মীয়, সহকর্মী কিংবা পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও টাকা চাওয়া হতে পারে। ফলে কোনো অস্বাভাবিক বার্তা বা ফোনকল পেলেই সরাসরি অর্থ পাঠানো উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, ভয়েস ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর নকল করে প্রতারণার নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে কাগজপত্র তৈরি করার ঘটনাও ঘটছে। পরে এসব জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
চিফ হুইপের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু সরকারি দলের সদস্যরাই নন, বিরোধী দলের অনেক সংসদ সদস্যও এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ফলে দলীয় পরিচয়ের বাইরে এটি একটি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলে সাধারণ মানুষও এ বিষয়ে সতর্ক হতে পারবেন। গণমাধ্যম ও টেলিভিশনের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন, যাতে প্রতারকদের নতুন কৌশল সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিষয়টির প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, মোবাইল হ্যাক, ভয়েস ক্লোনিং কিংবা এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার শিকার হলে ব্যক্তিগতভাবে ভুক্তভোগীকে দায়ী করা যায় না। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নির্বাহী বিভাগ এবং দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কেউ যদি সংসদ সদস্যের পরিচয় বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে প্রতারণা করে, তাহলে সেটি প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
জবাবে চিফ হুইপ জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রতারণা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) শুরু করেছে। প্রযুক্তিগতভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে এ ধরনের প্রতারণা কমানো যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল নম্বর হ্যাক বা পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ চাওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যাচাই ছাড়া কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করা। কোনো পরিচিত ব্যক্তি টাকা চাইলেও সরাসরি ওই নম্বরে বিশ্বাস না করে অন্য কোনো মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জরুরি ভিত্তিতে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করা হলে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।
এদিকে সংসদ ভবনের নিরাপত্তা ও প্রবেশব্যবস্থা নিয়েও একই আলোচনায় কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, সংসদের বিভিন্ন লবিতে ফেস রিডিং ডিভাইস রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা এসব ডিভাইসে যথাযথভাবে ফেস রিডিং না করেই চলাচল করেন।
তিনি সংসদ সদস্যদের নিয়ম মেনে ফেস রিডিং করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে সংসদ কক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় নির্ধারিত নিরাপত্তা পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্য সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
চিফ হুইপের বক্তব্যে উঠে আসা বিষয়গুলো থেকে স্পষ্ট, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন কৌশল নিয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মোবাইল হ্যাকিং, ভয়েস ক্লোনিং এবং স্বাক্ষর জালিয়াতির মতো ঘটনায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। বিটিআরসির উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।