দুই মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা হত্যা এবং অন্যটি হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা।
হত্যাচেষ্টা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনকে আসামি করে গত ২৭ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইব্রাহিম খলিল। মামলাটিতে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ঢাকার সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেনসহ অন্যরা।
মামলার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আসামিদের মধ্যে কামরুল ইসলাম ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তিনজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
যাত্রাবাড়ী থানার প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক মহিন উদ্দিন জানান, এই মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানার রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান প্রান্ত ও নাদিম। ওই সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
গুলিতে গুরুতর আহত হন প্রান্ত। একটি গুলি তার থুতনি দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। একই ঘটনায় নাদিমের বাম হাঁটুতে গুলি লাগে। স্থানীয়ভাবে উদ্ধারের পর প্রান্তকে যাত্রাবাড়ীর সালমান হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেডে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নাদিম চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
পরে প্রান্তের চাচার পরিচয়ে নাদিম ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। তদন্ত শেষে মামলায় ৩০ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা রাজমিস্ত্রি মো. বাবুল মৃধা হত্যা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে গত ১৩ আগস্ট অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাহমুদুল হাসান ইরফান।
এই মামলার আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়াও রয়েছেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, যাত্রাবাড়ী-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, পটুয়াখালী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, বরিশাল-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ।
এ ছাড়া মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মামলাটির অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে আদালতে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীর দনিয়া ও লাকি কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছেলে আবু তালেবকে খুঁজতে বাড়ি থেকে বের হন তার বাবা বাবুল মৃধা।
লাকি কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় পৌঁছানোর পর তিনি গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর তাকে বিজিবি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ২২ আগস্ট তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ৫২ দিন পর, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিএমএইচে মারা যান বাবুল মৃধা। তার মৃত্যুর ঘটনায় স্ত্রী সীমা বেগম একই বছরের ১৯ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন।
এই মামলায় কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তিনজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আরও আটজন জামিনে আছেন এবং অন্য আসামিরা পলাতক বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে যাত্রাবাড়ী এলাকায় সংঘটিত হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগের তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে। এখন আদালতে অভিযোগপত্র গ্রহণ, আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা এবং মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হবে।