শিল্প-কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
শিল্প-কারখানায় চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকে শিল্প খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কার্যালয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ আশ্বাস দেন। বৈঠকে তিনি সভাপতিত্ব করেন। এতে দেশের ২০টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে চলমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, শিল্প উৎপাদন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাসের বিষয়টি তুলে ধরেন। তারা জানান, শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের সংকটের কারণে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যে ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারের ওপর আস্থা রাখতে চায়। একই সঙ্গে সরকার যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, সেগুলোর কার্যকর ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রত্যাশা করছেন তারা।
তিনি বলেন, নতুন করে যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে, তা মঙ্গলবার রাত থেকে আর থাকবে না বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। এর ফলে শিল্প খাত আগের তুলনামূলক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন।
ফজলুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ার বিষয়টি। উৎপাদন চালু রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি সরকারের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
বৈঠকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জানান, ২০২৮ সালের আগে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) চালুর বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। নতুন এই টার্মিনাল চালু হলে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও পুনর্গ্যাসীকরণের সক্ষমতা বাড়বে।
তিনি জানান, নতুন এফএসআরইউসহ সরকারের মোট পাঁচটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে থাকা দুটি টার্মিনালের পাশাপাশি আরও তিনটি ভাসমান টার্মিনাল যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে।
মাহদী আমিন আরও জানান, ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিল্প উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি হলে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়বে।
দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য জ্বালানি সরবরাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ে। তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
সোমবারের বৈঠকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বর্তমান সংকট দ্রুত মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার আশ্বাসের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণে এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত জ্বালানি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে শিল্প খাতের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে দেওয়া আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে আগামী দিনগুলোতে শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারের ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।