তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুর্নীতির অনুসন্ধানে গিয়ে সাংবাদিক হামলার অভিযোগ
বিশেষ প্রতিনিধি
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ও কয়েকটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালনির্ভরতা, সরকারি রেকর্ডের নিরাপত্তা এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী (জি এম রফিক) হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
অভিযোগপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমে একটি দালালনির্ভর নেটওয়ার্কের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক, ওমেদার, নকলনবিশ ও নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দালাল ছাড়া কাজ কঠিন—এমন অভিযোগ
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ২ নম্বর গেটসংলগ্ন এলাকায় প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ‘রহিম’ ছদ্মনামের এক ব্যক্তির। তিনি নিজেকে একজন সাব-রেজিস্ট্রারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে জমি রেজিস্ট্রিসহ বিভিন্ন কাজ করে দেওয়ার দাবি করেন। নিজে নিজে কাজ করতে গেলে সময় বেশি লাগবে বলেও তিনি জানান।
অভিযোগ রয়েছে, কমপ্লেক্স এলাকায় প্রায় অর্ধশত দালাল সক্রিয় এবং তাঁদের সঙ্গে এক শ্রেণির দলিল লেখক, ওমেদার ও নকলনবিশের যোগাযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া দেড় কোটি টাকা মূল্যের জমির সাব-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির খরচ জানতে চাইলে সরকারি নির্ধারিত ফি ও ট্রেজারি চালানের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দলিল স্বাক্ষর হবে না—এমন দাবির কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেকর্ড রুমে নিয়োগপত্রবিহীনদের প্রবেশের অভিযোগ
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ড রুম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পুরোনো দলিলের ভলিউম তল্লাশি, নকল সংগ্রহ ও রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে অনানুষ্ঠানিকভাবে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, অফিসের নিজস্ব জনবলের বাইরে ৩০ থেকে ৪০ জন ব্যক্তি নিয়োগপত্র ছাড়াই বালাম বা ভলিউম তল্লাশির কাজ করছেন। তাঁদের সঙ্গে সহকারী হিসেবে আরও কয়েকজন করে ব্যক্তি কাজ করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলেও তাঁদের নিয়োগের বৈধতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি রেকর্ড রুমে অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ থাকলে গুরুত্বপূর্ণ বালাম বই ও দলিলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
অভিযোগকারীরা বালাম বইয়ের পাতা পরিবর্তন, কেটে নতুন পাতা সংযোজন কিংবা তথ্য পরিবর্তনের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে রেকর্ড রুমের প্রবেশ রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
মোহাম্মদপুর ও খিলগাঁও অফিস ঘিরেও অভিযোগ
মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়েও ঘুষ লেনদেন এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের মাধ্যমে কাজ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি রেকর্ড রুমের চাবি ও সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তির প্রবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কথিত নিয়োগপত্রবিহীন কয়েকজনকে দিয়ে নিয়মিত নকল লেখার কাজ করানো হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি ফি ও নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং কথিত ‘টার্গেট’ পূরণের অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহকে ঘিরেও আইন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম এবং সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিক হামলার অভিযোগ
এসব অভিযোগের অনুসন্ধানের মধ্যেই ৯ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে সাংবাদিক জি এম রফিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তথ্য সংগ্রহের একপর্যায়ে কয়েকজন তাঁর সঙ্গে উত্তেজিত আচরণ করেন এবং তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগে কয়েকজন ওমেদার ও রেজিস্ট্রেশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং কারও ইন্ধন ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ
সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ১০ সেপ্টেম্বর লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সাংবাদিকদের নিরাপদে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় সাংবাদিক ফোরামও ঘটনার নিন্দা জানিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে আগামী রোববারের মধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকও ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তদন্তের দাবি
রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ও বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে নিয়োগপত্র ছাড়া কারা রেকর্ড রুমে প্রবেশ করছেন, তাঁদের অনুমতি কে দিয়েছেন, সরকারি রেকর্ডের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও সরকারি নথিপত্র যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সরকারি সেবার স্বচ্ছতার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই অভিযোগগুলোর পাশাপাশি হামলার ঘটনাটিও দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।