একসময় ছিলেন ছোট একটি পোশাক কারখানার মালিক। ব্যাংক ঋণ নিয়ে সেই কারখানা চালু করেন শাহরিয়ার আলম। প্রথমদিকে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও তিনি তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তার লক্ষ্য ছিল দ্রুত ধনী হওয়া—যে কোনো উপায়ে। নিজের হিসাবেই তিনি বুঝে ফেলেন, দ্রুত ধনী হওয়ার একমাত্র উপায় হলো রাজনীতিতে প্রবেশ করা। এমপি-মন্ত্রী হয়ে লুটপাটের মাধ্যমে সম্পদ গড়া—এটাই হয়ে ওঠে তার স্বপ্ন।
রাজনীতিতে আসার প্রথম উদ্যোগেই তিনি যোগাযোগ করেন রাজশাহীর তৎকালীন বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে। তিনি বিএনপিতে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে মিনু বুঝতে পারেন, শাহরিয়ারের রাজনীতিতে আগ্রহ কোনো আদর্শের কারণে নয়, বরং সম্পদ অর্জনের উদ্দেশ্যে। তাই মিনু তাকে পরামর্শ দেন ব্যবসাতেই মনোযোগ দিতে। মিনুর কথায় কাজ না হওয়ায় শাহরিয়ার এবার যোগাযোগ করেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। অভিযোগ রয়েছে, টাকা দিয়ে রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের মনোনয়ন কিনে নেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার ‘টাকা বানানোর মেশিন’।
২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন শাহরিয়ার আলম। পরবর্তীতে তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই তিনি শুরু করেন লুটপাট, ঘুষ-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
তার প্রথম নির্বাচনি হলফনামায় দেখা যায়, তিনি ছিলেন ভূমিহীন। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, আর ঋণ ছিল ৭৬ কোটি ১৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। কিন্তু এমপি হওয়ার পর ১৫ বছরের মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন হাজার কোটি টাকার মালিক। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে, তিনি এই বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন ঘুষ, নিয়োগবাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য ও সরকারি প্রকল্পে চাঁদাবাজির মাধ্যমে।
বর্তমানে শাহরিয়ার আলমের মালিকানায় রয়েছে আটটি পোশাক কারখানা। এছাড়া তিনি ‘রেনেসাঁ গ্রুপ’-এর নামে ‘দুরন্ত টেলিভিশন’-এর মালিক। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ তিনি পাচার করেছেন রাশিয়া, ব্রাজিল ও চীনে, যেখানে তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনি হলফনামায় তিনি অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ৮৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা, অর্থাৎ ২০০৮ সালের তুলনায় বেড়েছে ১৬৫ কোটি টাকা। আর ৭৬ কোটি টাকার ঋণও তিনি “পরিশোধ হয়েছে” বলে দেখান। তার দুই ছেলের অস্থাবর সম্পদও ২০১৮ সালের ৭৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে হয়েছে ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া শাহরিয়ার ও তার পরিবারের নামে এখন রয়েছে কমপক্ষে ৫১ বিঘা জমি, ঢাকার গুলশানে দুটি ফ্ল্যাট তার নামে, একটি ছেলের নামে এবং একটি দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে—সবগুলোই ৩,৬০০ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পর তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের চৌধুরীহাট এলাকায় ২৫ বিঘা জমি কেনেন। সেখানে গড়ে তোলেন বাংলো বাড়ি, গরুর খামার, টিস্যু কালচার ল্যাব ও বনসাই গবেষণাগার। ওই জমি দেখিয়ে ব্যাংক থেকে নেন প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঋণ। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নর্থ বেঙ্গল এগ্রো ফার্মস লিমিটেড’।
২০১৭ সালে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলাতেও ১৩ বিঘা জমি কেনেন, যেখানে তৈরি করেছেন আধুনিক খামারবাড়ি। সেখানে চাষাবাদ হয় দামি সবজি, মাছসহ বিভিন্ন ফসল। জানা গেছে, শাহরিয়ারের শৈশব কেটেছে লালমনিরহাটে, সেই সূত্রে সেখানে জমি কিনে তিনি এই কৃষি ব্যবসা গড়ে তোলেন। তার দীর্ঘদিনের এপিএস সিরাজুল ইসলামের বাড়িও একই এলাকায়।
রাজশাহীতে তার নির্বাচনি এলাকায় তিনি পোশাক কারখানা স্থাপনের প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকার জমি—যার মধ্যে রয়েছে সিনেমা হল, উপজেলা ভূমি অফিস সংলগ্ন জমি ও আরও বহু সম্পত্তি।
ব্যক্তিগত জীবনে প্রথম স্ত্রী আয়েশা আক্তার ডালিয়াকে তালাক দিয়ে তিনি নাটোরের লালপুরের এক আওয়ামী লীগ নেতার মেয়ে সিলভিয়া পারভীন লেনিকে বিয়ে করেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের প্রভাব খাটিয়ে লেনির মা রোকসানা মর্তুজা লিলিকে ২০২১ সালে মেয়র বানান। স্ত্রী লেনিকেও উপহার দেন গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি।
২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পর থেকেই শাহরিয়ার আলম তার এপিএস সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন টিআর-কাবিখা, সরকারি প্রকল্প, অনুদান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত সবকিছু। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিতেন তারা।
রাজনীতি শুরুর সময় ১০ লাখ টাকার হোন্ডা সিআরভি গাড়ি ব্যবহার করতেন শাহরিয়ার আলম। এখন তার গাড়ির দাম এক কোটি টাকার বেশি, স্ত্রীর গাড়ির দামও প্রায় একই।
নিঃস্ব থেকে শুরু করে আজ হাজার কোটি টাকার মালিক এই রাজনীতিকের উত্থান কোনো সাফল্যের গল্প নয়—এটি দুর্নীতি, অর্থপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের এক নগ্ন ইতিহাস।