যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে নিজের প্রেসিডেন্সির স্মৃতি ধরে রাখতে নেওয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে নিজের নাম যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু রাজনৈতিক সমালোচনাই নয়, সরকারি স্থাপনা ও সম্পদে নিজের নাম ব্যবহারের কয়েকটি উদ্যোগকে ঘিরে ইতোমধ্যে আইনি লড়াইয়েও জড়িয়েছেন তিনি।
নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘ট্রায়াম্ফাল আর্চ’ বা বিজয়ের তোরণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, তিনি দায়িত্ব থেকে চলে গেলে এমন প্রকল্প আর কেউ করবে না। তার ভাষায়, তিনি বিদায় নেওয়ার পর আর কেউ এ ধরনের উদ্যোগ নেবেন না।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে ‘ট্রায়াম্ফাল আর্চ’ ছাড়াও রয়েছে হোয়াইট হাউসের বিতর্কিত বলরুম। নিজের নাম যুক্ত করার পরিকল্পনা এবং সরকারি স্থাপনায় তার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও ট্রাম্প এসব উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বলরুম নির্মাণের জন্য মানুষের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে নামকরণ ও সরকারি সম্পদে পরিবর্তনের বিষয়টি এখন কেবল রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। কেনেডি সেন্টার ও এর ক্যাম্পাসের নাম নিজের নামে করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। একইভাবে ওয়াশিংটনের একটি জনপ্রিয় গলফ কোর্সে ব্যাপক পরিবর্তন আনা এবং লিঙ্কন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কার নিয়েও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
সমালোচকদের মূল প্রশ্ন—একজন বর্তমান প্রেসিডেন্ট কি নিজের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে ফেডারেল সম্পত্তি, ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বদলে দিতে পারেন? ঐতিহাসিক ও সরকারি স্থাপনার ক্ষেত্রে প্রচলিত নাম, সংরক্ষণ আইন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও মামলাগুলোতে আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
বিশেষ করে কেনেডি সেন্টারের মতো জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগকে ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনগত কর্তৃত্বের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ফলে ট্রাম্পের নামকরণ-প্রবণতা ভবিষ্যতে শুধু রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়, ফেডারেল সম্পত্তির ব্যবহার ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
শুধু স্থাপনা নয়, বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ ও কর্মসূচিতেও নিজের নাম যুক্ত করেছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে রয়েছে ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’, ‘ট্রাম্পআরএক্স’ এবং ১০ লাখ ডলারের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত আইনি বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কর্মসূচি ‘ট্রাম্প গোল্ড কার্ড’। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরও ট্রাম্পের ছবি সংবলিত ‘প্যাট্রিয়ট পাসপোর্ট’ নামে একটি স্মারক তৈরি করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের নাম ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ট্রাম্প-ক্লাস’ যুদ্ধজাহাজ এবং ‘ইউএসএস ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প’ নামে একটি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের পরিকল্পনা।
তবে ট্রাম্পের সবচেয়ে প্রিয় এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে হোয়াইট হাউসের বলরুম। সাবেক ইস্ট উইংয়ের স্থানে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পে সোনালি মার্বেল, বড় ঝাড়বাতি এবং ভবনের বাইরেও সোনালি ফিনিশিং রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বলরুমের নকশা, ব্যয় এবং সরকারি সম্পত্তিতে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত পরিচয় ব্যবহারের বিষয়টি ইতোমধ্যেই বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের এই স্থাপত্য ও নামকরণ উদ্যোগ তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, নাকি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের উদাহরণ—এ প্রশ্নই এখন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।