শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন ১৬ ডিসেম্বর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরোপুরি চালু করা সম্ভব না হলেও অন্তত আংশিকভাবে টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এটি দ্রুত যাত্রীসেবায় যুক্ত করা। এর আগে টার্মিনালের ভবন উদ্বোধন করা হলেও সেটিকে কার্যকরভাবে চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বিশাল অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও সেখানে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
ভবন উদ্বোধন হলেও চালুর উদ্যোগ ছিল না
তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শনের পর এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, আগের সময়ে টার্মিনালের ভবন উদ্বোধন করা হলেও সেটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাজ অসম্পন্ন ছিল। বিশেষ করে ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল।
তিনি বলেন, শুধু একটি ভবন তৈরি ও উদ্বোধন করলেই বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল কার্যকর হয়ে যায় না। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, মেশিনপত্র, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা প্রস্তুত করতে হয়। তৃতীয় টার্মিনালের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্ব ভাগাভাগিতে বাংলাদেশের অংশ বেড়েছে
তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাজস্ব ভাগাভাগি। বিমানমন্ত্রী জানান, শুরুতে রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ১৫ শতাংশ এবং জাপানি কোম্পানির জন্য ৮৫ শতাংশ রাখার কথা ছিল।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক ও আলোচনার পর বাংলাদেশের রাজস্ব অংশ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের অংশ ২৭ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
এম রশিদুজ্জামান মিল্লাট বলেন, রাজস্বের অংশ ২৭ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। তাঁর মতে, টার্মিনাল চালু হলে এখান থেকে যে আয় হবে, তা ভবিষ্যতে ঋণের কিস্তি পরিশোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাইকার ঋণে নির্মাণ হয়েছে টার্মিনাল
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকার ঋণ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিমানমন্ত্রী জানান, তৃতীয় টার্মিনালের কিস্তি ইতোমধ্যে পরিশোধ করা শুরু হয়েছে। কিন্তু টার্মিনালটি চালু না থাকায় এর নিজস্ব আয় থেকে কিস্তি পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়নি। বর্তমানে সিভিল এভিয়েশনের অন্যান্য খাত থেকে আয় করে সেই অর্থ দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে আরও ৯০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ফলে টার্মিনাল দ্রুত চালু করা সরকারের জন্য আর্থিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য খাতের আয়ের ওপর চাপ
মন্ত্রী বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা সম্ভব না হলে সিভিল এভিয়েশনের অন্যান্য খাতের আয় থেকেই এর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। এতে সংস্থাটির অন্যান্য কার্যক্রমের ওপরও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে টার্মিনালটি দ্রুত চালু করে এখান থেকে আয় করার সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার। আংশিকভাবে হলেও ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে এটিও অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীসেবা থেকে শুরু করে বিমানবন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমের পরিধি বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন টার্মিনাল থেকে রাজস্ব আয় করার সুযোগ তৈরি হবে, যা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে সহায়ক হবে।
১৬ ডিসেম্বর আংশিক চালুর লক্ষ্য
বিমানমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালটি আংশিকভাবে হলেও চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দেশের বিমান পরিবহন খাতের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প। এর কার্যক্রম শুরু হলে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা, বিমান পরিচালনা এবং বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের প্রত্যাশা, নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর বিদ্যমান চাপ কমবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাড়তে থাকা যাত্রী ও ফ্লাইটের চাহিদা মোকাবিলায় বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও ব্যবস্থাপনার কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব প্রস্তুতি শেষ করে নির্ধারিত ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত আংশিক কার্যক্রম শুরু করতে চায় সরকার।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি এর আর্থিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে জাইকার ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বিবেচনায় নিয়ে টার্মিনাল থেকে রাজস্ব আয় নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকার পাচ্ছে।