বেদে পল্লীর ৪০ পরিবারকে খাস জমি দিলো ঢাকা জেলা প্রশাসন
ঢাকার ধামরাই উপজেলার দুই গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে ৪০টি বেদে পরিবারকে খাস জমি, বেদে পল্লীর ২৫ জন সদস্যকে সেলাই মেশিন এবং সড়ক নির্মাণের জন্য ৫ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব সহায়তা বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন করতেই এসব সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে পর্যায়ক্রমে জেলার অন্যান্য উপজেলার বেদে সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোকেও সহযোগিতার আওতায় আনা হবে।
সেলাই মেশিনে কর্মসংস্থানের সুযোগ
বেদে পল্লীর ২৫ জন সদস্যের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, একটি সেলাই মেশিন শুধু একজন ব্যক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে না; এর মাধ্যমে একটি পরিবারের অন্তত পাঁচজন সদস্যের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, যারা আগে থেকেই সেলাইয়ের কাজ জানেন কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে কাজ করতে পারছিলেন না, তাদের জন্য এই সেলাই মেশিন আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করবে। এর মাধ্যমে পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে এবং তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সেলাই মেশিন দেওয়ার পাশাপাশি বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের বাড়ির আঙিনায় থাকা ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানোর পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। এসব জায়গায় ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালনের জন্য তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে ছোট পরিসরে কৃষি ও গবাদিপশু-পাখি পালনের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করলে পরিবারের অতিরিক্ত আয় তৈরি হতে পারে। এতে শুধু একটি উৎসের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।
সড়ক নির্মাণে ৫ লাখ টাকা অনুদান
বেদে পল্লীর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সড়ক নির্মাণে ৫ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগের ফলে পল্লীর বাসিন্দাদের চলাচলের সমস্যা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ৪০টি বেদে পরিবারকে খাস জমি দেওয়ার উদ্যোগকে তাদের স্থায়ীভাবে বসবাস ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আবাসন, যোগাযোগ ও আয়-রোজগারের সুযোগ—এই তিনটি ক্ষেত্রে একসঙ্গে সহায়তা পেলে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর জীবনমান পরিবর্তনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সহায়তা পেয়ে খুশি বেদে সম্প্রদায়ের সদস্যরা
জেলা প্রশাসনের দেওয়া সহায়তায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন বেদে পল্লীর বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, খাস জমি, সেলাই মেশিন এবং আর্থিক সহযোগিতা তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বেদে পল্লীর বাসিন্দা পূর্ণিমা আক্তার জেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সেলাই মেশিন পাওয়ায় তারা এখন কাজ করে পরিবারের আর্থিক সহায়তা করতে পারবেন।
তিনি জানান, আগে থেকেই তিনি সেলাইয়ের কাজ জানতেন। কিন্তু নিজস্ব মেশিন না থাকায় সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করার সুযোগ ছিল না। এখন সেলাই মেশিন পাওয়ায় তিনি নিয়মিত কাজ করতে পারবেন এবং পরিবারের আয়ে অবদান রাখতে পারবেন।
বেদে পল্লীর আরেক বাসিন্দা হেনা বলেন, তারা এত সহযোগিতা পেয়ে আনন্দিত। এর আগেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের অনুদান দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
আরও পরিবারকে সহায়তার আশ্বাস
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে। ধামরাইয়ের দুই গ্রামের বেদে পরিবারগুলোর পাশাপাশি জেলার অন্যান্য এলাকার বেদে সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোকেও পর্যায়ক্রমে সহযোগিতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু এককালীন সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আয় করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ কারণে সেলাই মেশিন দেওয়ার পাশাপাশি কৃষিকাজ ও হাঁস-মুরগি পালনের মতো উদ্যোগেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসককে উপহার
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে বেদে পল্লীর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমকে একটি ব্যাগ উপহার দেওয়া হয়। উপহার পেয়ে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং বেদে সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে একই সঙ্গে আবাসন, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব সহায়তা কাজে লাগিয়ে বেদে সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে আরও সক্ষম হয়ে উঠবে এবং সমাজের মূলধারায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে।