রিজভী: ভারতের হাতে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘সুইচ’, যেকোনো সময় সরবরাহ বন্ধের শঙ্কা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন, ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ নিয়ে দেশটি যেকোনো সময় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর দাবি, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বা ‘সুইচ’ ভারতের হাতে থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ বা চালু করার সুযোগ রয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রিজভী।
‘পতিত স্বৈরাচারী খুনি হাসিনা ভারতের ইন্ধনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত’—এমন অভিযোগের প্রতিবাদে কর্মসূচিটির আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন।
রিজভী বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, গুম ও হত্যার মতো বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশ একটি কঠিন সময় পার করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলো সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে সংবর্ধনা দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে সাইডলাইনে রাখার পরিকল্পনা ছিল। তাঁর ভাষ্য, তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দেশের মর্যাদা রক্ষা করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রসঙ্গে রিজভী আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিন আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ইউনিট নষ্ট হওয়ার খবর প্রচার করা হয়। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
রিজভী বলেন, ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘সুইচ’ ভারতের হাতে রয়েছে। ফলে তারা যেকোনো সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ বা চালু করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক কোনো সমীকরণ রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিএনপির এই নেতা।
এ সময় ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রিজভী। তাঁর অভিযোগ, শেখ হাসিনাসহ জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতন ও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অনেকে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়েও বক্তব্য দেন রিজভী। তিনি দাবি করেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট বর্তমান সরকারের তৈরি নয়; বরং এটি বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সংকট মোকাবিলায় সরকার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আনার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানান।
রিজভী আরও দাবি করেন, সংকটের মধ্যেও দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের সরকারের সময়ের তুলনায় আড়াই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। তবে এসব তথ্যের বিস্তারিত পরিসংখ্যান বা উৎস তিনি সমাবেশে উপস্থাপন করেছেন কি না, তা বক্তব্যের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও এর আশপাশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়েও বক্তব্য দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ নিতে চাইছে এবং মধুর ক্যান্টিনকে ‘বিশ্রাম মঞ্জিল’ বানানোর চেষ্টা করছে। এ ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
রিজভী বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় রাজনৈতিক দল ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের পক্ষে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেন এবং দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সিনিয়র সহসভাপতি আলমগীর কবির, সাধারণ সম্পাদক ড. কে এম আই মন্টি, আব্দুল হাকিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ আনোয়ারসহ সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।