ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী
দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্যের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি বলেছেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, উৎপাদক এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আফরোজা খানম বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য অনেকাংশে নির্ভর করে তারা কী ধরনের খাবার গ্রহণ করছে তার ওপর। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্থ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগের। বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মান পরীক্ষা করে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা থেকে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি। প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের বিষয়ে ভোক্তাদের সঠিক তথ্য জানাতে হবে।
খাদ্যমন্ত্রী খাদ্যপণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম দেশব্যাপী আরও বিস্তৃত করার নির্দেশনা দেন।
সভায় দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে থাকা মোবাইল ল্যাবরেটরির বিষয়টিও উঠে আসে। বর্তমানে আটটি বিভাগে আটটি মোবাইল ল্যাব রয়েছে জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এ সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪টি জেলায় মোবাইল ল্যাব স্থাপনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তার মতে, জেলায় জেলায় মোবাইল ল্যাব থাকলে ঘটনাস্থলেই খাদ্যপণ্যের প্রাথমিক পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। এতে অনিরাপদ বা মানহীন খাদ্য শনাক্ত করার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ল্যাবরেটরি ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন খাদ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে ল্যাবরেটরি পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। নিজস্ব অবকাঠামো তৈরি করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ একটি মানসম্মত খাদ্য পরীক্ষাগার গড়ে তোলা যাবে।
এ জন্য দ্রুত জায়গা নির্ধারণ, প্রকল্প প্রণয়ন এবং অর্থায়নসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা বলেন খাদ্যমন্ত্রী। পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে খাদ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় বিএফএসএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবির বিষয়েও কথা বলেন খাদ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উত্থাপিত দাবিগুলোর অনেকগুলোই যৌক্তিক। পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে আফরোজা খানম বলেন, তিনি তাদের শুধু মন্ত্রী হিসেবে নয়, সহকর্মী হিসেবেও দেখতে চান। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অর্জিত জ্ঞান দেশের কাজে লাগানোরও আহ্বান জানান খাদ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সুযোগ দিচ্ছে। এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে ফিরে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে খাদ্যসচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কিছু সমস্যা অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করতে হবে। তবে সমস্যার সমাধানের অপেক্ষায় বসে না থেকে দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।
সভায় পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সার্বিক কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি প্রতিষ্ঠানের চলমান কার্যক্রম, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে বিদ্যমান সংকট এবং এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোয়েব একটি প্রেজেন্টেশনে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, বিএফএসএর পথচলার ইতিহাস, চলমান কার্যক্রম, বিভিন্ন সমস্যা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। স্বাগত বক্তব্য দেন কর্তৃপক্ষের সচিব শ্রাবস্তী রায়।
মতবিনিময় সভায় কর্মকর্তাদের মধ্যে গবেষণা কর্মকর্তা মো. তায়েফ আলী এবং কর্মচারীদের পক্ষে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী নুরন্নবী বক্তব্য দেন। এ সময় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে খাদ্যমন্ত্রী বিএফএসএর মিনি ল্যাব বা মোবাইল ভ্যান এবং ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট ল্যাব অপারেটররা এ সময় মিনি ল্যাব ও পরীক্ষাগারের কার্যক্রম এবং খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাকে বিস্তারিত অবহিত করেন।