সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী
নিউইয়র্ক, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য সরকারের রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলায় দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দল, মত, ধর্ম ও বর্ণের পার্থক্য না করে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর মতে, নাগরিকদের ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ তৈরির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; অর্থনীতিতেও গণতান্ত্রিক সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন দেশের প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। তাই নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে এসব কর্মসূচিকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
প্রযুক্তি ও এলডিসি উত্তরণ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। তাই বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে এআই-ভিত্তিক বৈষম্যে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এই উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। উত্তরণকে টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
শান্তি, ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সংঘাত নিরসনে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন।
তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর ফলে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে উল্লেখ করে তিনি নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু, অভিবাসন ও শান্তিরক্ষা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথাও জানান তিনি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের পাশাপাশি অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সবশেষে তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, নারীর আত্মবিশ্বাস ও শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় নিয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ কাজ করছে।