জাতিসংঘে আজ বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ বৃহস্পতিবার বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা এবং বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ ও অনুভূতিকে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে বাংলায় বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এসব তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি নিয়ে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভাষণ বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাদের ধারাবাহিকতায় এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলা ভাষায় দেশের মানুষের কথা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন।
গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও কৃষি নিয়ে আলোচনা
সফরের দ্বিতীয় দিনে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং ‘স্মার্ট ফার্মার কার্ড’ চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং সরকারের এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও আলোচনায় আসে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে বলে মাহদী আমিন জানান।
স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে গেটস ফাউন্ডেশনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা এবং যৌথ অংশীদারত্বের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে শিগগিরই সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করবে বলেও জানানো হয়।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে পাঁচ প্রস্তাব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মানবিক সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে। মাহদী আমিন বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে।
ক্রোয়েশিয়া ও ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
সফরের দ্বিতীয় দিনে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বা অভিবাসনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী ও অভিবাসীদের নিরাপত্তা ও স্বার্থরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা হয়।
জলবায়ু ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব
‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সভায় বাংলাদেশের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। নদী ও খাল খনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো এবং গ্রিন এনার্জির প্রসারের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দাবিও তুলে ধরেন তিনি।
এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বোয়িংয়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।
সবশেষে আজ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।