1. dailymorningvoice@gmail.com : dailymorningvoice : ismail hossain
  2. jahid@gmail.com : jahid hasan : jahid hasan
  3. hafejjubayera@gmail.com : Jubayer Ahmad : Jubayer Ahmad
ঢাকা ওয়াসার পদ্মা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, নেপথ্যে কারা?
Thursday, 10 September 2026, 05:23 pm
Headline :
ইরানের পাশে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেন রাষ্ট্রপতি অন্য মামলা না থাকলে সাজা শেষে খালাস পাবেন বিডিআর সদস্যরা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি বাড়াতে ইন্দোনেশিয়ার প্রতি আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন: পানিসম্পদ মন্ত্রী শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ আইন অনুযায়ী নির্ধারণ হবে: আইনমন্ত্রী পলিথিন-প্লাস্টিক বন্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে কর আদায় নয়: অর্থমন্ত্রী শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন ১৬ ডিসেম্বর নেপালে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করলেন মামুনুল হক মেডিক্যাল কলেজে আসন বাড়ানোর পরিকল্পনা, জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ঢাকা ওয়াসার পদ্মা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, নেপথ্যে কারা?

  • Update Time : Thursday, 10 September, 2026, 05:15 pm
  • 5 Time View



ঢাকা ওয়াসার পদ্মা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, নেপথ্যে কারা?

রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয় পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্প। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল পদ্মা নদীর পানি শোধন করে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি ঢাকায় সরবরাহ করা। তবে প্রকল্প চালুর কয়েক বছর পরও সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বর্তমানে প্রকল্প থেকে প্রায় ২৩ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম।

অর্থাৎ বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটির নির্ধারিত সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই কাজে লাগছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকল্পের নকশা, পাইপের মান, ঠিকাদারি চুক্তি, চূড়ান্ত বিল পরিশোধ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক অভিযোগ।

পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্পের প্রথম ফেজ ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। পরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর ২০১৯ সালে উদ্বোধন করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি ঢাকায় সরবরাহ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, পানি পরিবহনের ট্রান্সমিশন ব্যবস্থায় শুরু থেকেই নানা সমস্যা ছিল। বর্তমান ওয়াসা প্রশাসনও প্রকল্পের মূল নকশায় ত্রুটির কথা জানিয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার এমডি আমিনুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নকশায় সমস্যা ছিল এবং ট্রান্সমিশন লাইনের পরিকল্পনাও পুরোপুরি যথাযথ হয়নি। এ কারণে শোধনাগারে পানি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সেই পরিমাণ পানি ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে প্রায় ২৩ কোটি লিটার পানি সরবরাহ লাইনে প্রবেশ করছে।

এ পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের আগে নকশাগত সীমাবদ্ধতা কেন শনাক্ত করা হয়নি। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি একটি পানি সরবরাহ প্রকল্পে ট্রান্সমিশন ব্যবস্থার সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে।

প্রকল্পের অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে পাইপলাইন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না সিএএমসিই ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি—CAMCE কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবহৃত পাইপের মান ও স্পেসিফিকেশন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল।

সংশ্লিষ্ট নথিতে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ মতামতের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ডাকটিল কাস্ট আয়রনের ‘কে-৯ ক্লাস’ পাইপ ব্যবহারের কথা ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ‘কে-১০ ক্লাস’ পাইপ তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই হতে পারে। একই সঙ্গে চুক্তিতে পাইপের বিস্তারিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না বলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

এখানেই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রকল্পের পাইপের মান নির্ধারণের সময় দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও প্রকৌশলগত ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না।

পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্প নিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও বহু পুরোনো। দুদকের আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটিতে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের আওতায় ছিল। একই অনুসন্ধানে ঢাকা ওয়াসার আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের অভিযোগও উঠে আসে।

তৎকালীন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান হয়েছিল। পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের অভিযোগের অংশ হিসেবে তাকসিম এ খানকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয় বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।

এদিকে প্রকল্পের সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও তাকসিম এ খান ও তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের নাম এসেছে। প্রকল্পের সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী এমএ রশিদ অভিযোগ করেছেন, নিম্নমানের পাইপ ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তি জানানোর পর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে তার দাবি।

এমএ রশিদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের কেনাকাটা ও বাস্তবায়নে বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের চুক্তি, কারিগরি পরীক্ষার ফলাফল, বিল-ভাউচার এবং অন্যান্য নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, নির্ধারিত ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের সক্ষমতা নিশ্চিত না হলেও ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়। এমনকি ওয়ারেন্টি মেয়াদের মধ্যে ঠিকাদারের দায়িত্বে থাকা কিছু কাজ ঢাকা ওয়াসা নিজস্ব অর্থায়নে করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব কাজে প্রায় ১০৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

ঠিকাদারের জামানত হিসেবে রাখা ১০ শতাংশ অর্থ, যার পরিমাণ প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা, পরিশোধের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোনো কাজ ঠিকাদারের দায়িত্বে থাকার পরও যদি ওয়াসাকে নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যয়ের দায় কেন ঠিকাদারের ওপর বর্তায়নি—এ প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

এ জন্য প্রকল্পের মূল চুক্তি, কাজের পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, কমিশনিং রিপোর্ট, পারফরম্যান্স টেস্ট এবং জামানত ছাড়ের নথি পর্যালোচনা করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ওয়াসার সাবেক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, CAMCE-এর সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির সময় যথেষ্ট দরকষাকষি করা হয়নি। এতে সরকারি অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের দাবি। তবে শুধু প্রকল্পের ব্যয় বেশি হওয়াকে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, কারিগরি পরিবর্তন কিংবা চুক্তির সংশোধনের কারণেও ব্যয় বাড়তে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে নথিভিত্তিক আর্থিক নিরীক্ষা প্রয়োজন।

CAMCE-এর স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নির্ভরযোগ্য দলিল প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে এজেন্সি চুক্তি, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া প্রকল্পের অর্থের একটি অংশ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক ফান্ড এবং সজীব ওয়াজেদ জয় ও শেখ রেহানার কাছে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এগুলো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এবং প্রমাণিত তথ্য নয়। তাই আর্থিক নথি, ব্যাংক লেনদেন ও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া এসব অভিযোগকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে ওএসডি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বর্তমান ওয়াসা এমডিও জানিয়েছেন, রফিকুল ইসলাম বর্তমানে নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্বপূর্ণ পদে নেই। তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ থাকার বিষয়টি তিনি শুনেছেন এবং এ বিষয়ে দুদকের কোনো লিখিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ওয়াসা পায়নি বলেও জানান।

পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের বাইরেও তাকসিম এ খানকে ঘিরে ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার এবং গুলশান-বারিধারা লেক প্রকল্প নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের আওতায় ছিল।

সব মিলিয়ে পদ্মা প্রকল্পের বর্তমান বাস্তবতা নতুন করে জবাবদিহিতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্প থেকে যদি বর্তমানে প্রায় ২৩ কোটি লিটার পানি পাওয়া যায়, তাহলে শুধু কারিগরি ত্রুটির কথা বলেই বিষয়টি শেষ করা যাবে না। নকশা প্রণয়ন, পাইপের মান নির্ধারণ, ঠিকাদারি চুক্তি, কাজের তদারকি, বিল পরিশোধ এবং জামানত ছাড়—প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বাধীন প্রকৌশলগত মূল্যায়ন ও পূর্ণাঙ্গ আর্থিক অডিট। একই সঙ্গে দুদকের পুরোনো অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা দরকার। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগও জরুরি।

কারণ পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের অর্থ এসেছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বৈদেশিক অর্থায়ন ও জনগণের অর্থ থেকে। তাই প্রকল্পের সক্ষমতার ঘাটতি শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের ব্যবহার, নাগরিক সেবার মান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা। প্রকল্পের নথি ও স্বাধীন তদন্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে—এটি কেবল নকশাগত ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে আর্থিক অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলারও কোনো ভূমিকা ছিল।

Facebook Comments Box
Please follow and like us:
Pin Share
More News Of This Category