বিশেষ প্রতিনিধি
জুলাই আন্দোলনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমিত পরিচিতি থাকলেও ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আলোচনায় আসেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে পরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। তবে দায়িত্ব পালনের সময় ও পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৪ মার্চ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে। এর পরদিন সংবাদ সম্মেলনে নিজের ও পরিবারের ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশ করেন তিনি।
আসিফের বক্তব্য অনুযায়ী, তার নামে দুটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের একটি সঞ্চয়ী হিসাবে ছিল ৯ হাজার ৯৩০ টাকা। এছাড়া সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় একটি বেতন হিসাব খোলা হয়। ওই হিসাবে ১৬ মাসে বেতন-ভাতা এবং পাঁচটি বিদেশ সফরের টিএ-ডিএ বাবদ অর্থ জমা হয়। হিসাবে মোট জমা বা ক্রেডিট ছিল ৮৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং উত্তোলন বা ডেবিট ৭৬ লাখ ৩ হাজার টাকা। দুটি হিসাব মিলিয়ে তার কাছে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৬ টাকা।
পরিবারের হিসাব সম্পর্কেও তথ্য দেন আসিফ। তার বাবা পেশায় শিক্ষক এবং তার নামে পাঁচটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে বলে তিনি জানান। এসব হিসাবে মোট ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৭১১ টাকা জমা ছিল। বাবার ১০ লাখ টাকার সার্ভিস লোন ছিল, যার কিস্তি বেতন থেকে কেটে নেওয়া হয়। মায়ের হিসাবে ২১ হাজার ১৫৪ টাকা এবং স্ত্রীর হিসাবে ৬১৩ টাকা থাকার কথাও তিনি জানান।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার ও পদায়ন বাণিজ্যের মতো বিষয় রয়েছে।
একটি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ কমিশন হিসেবে দিতে হতো। কথিত এ লেনদেন তদারকিতে আসিফের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলমের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আব্দুস সালামকে এমডি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের একটি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো এবং বাকি অর্থ নগদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এসেছে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজে ১০ শতাংশ কমিশনের শর্ত ছিল বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। এজাজের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং দুদক তার বিষয়ে তদন্ত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরে বদলি ও পদায়ন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কয়েকটি প্রকল্পে বিপুল অর্থের অনিয়ম এবং কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে।
টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়। এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পদায়ন সংক্রান্ত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন জেলা প্রশাসক নিয়োগে তার দেওয়া ৪৮টি ডিও লেটারের মধ্যে ৩৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং এ ক্ষেত্রে অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে।
তার তৎকালীন সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পরে তিনি বিদেশে চলে যান এবং বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
এছাড়া আসিফের বাবার প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি তালিকাভুক্তি এবং আসিফের সম্পদ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও দুবাইয়ে বিনিয়োগের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এ ধরনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে আসিফ মাহমুদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।