অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থপাচার নিয়ে জমা পড়া অভিযোগগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের দুর্নীতি ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে যেগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাবে, সেগুলো আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান বা তদন্তের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে দুদক।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুই হাজারের মতো অভিযোগ দুদকে জমা পড়ে। এর মধ্যে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের নথিতে বলা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও সেখানে রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, শুধু আসিফ মাহমুদ নন, অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ জমা পড়েছে। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিচারক, আইন কর্মকর্তা ও সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ এবং বদলি, পাশাপাশি জামিন ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় সম্পদ এবং সুইস ব্যাংকে হিসাব থাকার অভিযোগও নথিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগ জমা পড়া বা প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হওয়া কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর মাধ্যমে দুবাই ও লন্ডনে অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও তোলা হয়েছে। একইভাবে সাবেক উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে সম্পদ কেনার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, অধিকাংশ অভিযোগই বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে কোনো অভিযোগের সত্যতা বা গ্রহণযোগ্য ভিত্তি পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিদেশে অর্থপাচারসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে জমা অর্থ বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে দাঁড়ায়, যেখানে ২০২৪ সালে তা ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। তবে এই অর্থের পুরোটা অবৈধভাবে অর্জিত বা পাচার করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত শুধু পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেওয়া যায় না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগগুলো সামনে আসায় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি ও অর্থের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন দাবি থাকলেও প্রকৃত চিত্র জানতে হলে তদন্তের ফলাফল এবং প্রামাণ্য নথি প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
দুদকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে রেখে যাচাই করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বক্তব্য গ্রহণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে যেসব অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া যাবে, সেগুলোই অনুসন্ধানের আওতায় নেওয়া হবে। ফলে ইউনূস সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা বিপুল অর্থের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের প্রকৃত সত্য তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।