মস্কোর ওপর আরও চাপ বাড়ানোর আহ্বান ইইউ পররাষ্ট্রনীতি প্রধানের
রাশিয়ার কথিত ‘হাইব্রিড হামলা’ মোকাবিলায় মস্কোর ওপর আরও কঠোর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা ক্যালাস। একই সঙ্গে রুশ নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়ার নীতি পুনর্বিবেচনা এবং ইউরোপে রুশ কূটনীতিকদের চলাচলে আরও কড়াকড়ি আরোপের বিষয়েও মত দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে কাজা ক্যালাস এসব মন্তব্য করেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে তার বক্তব্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
কাজা ক্যালাস বলেন, ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান থাকলেও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ইউরোপের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড আরও বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছেন বলে ইইউ মনে করছে।
তিনি বলেন, পুতিনকে থামানো না হলে তিনি নিজে থেকে থামবেন না। ফলে রাশিয়া যখন আরও বড় ঝুঁকি নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ইউরোপকেও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বেশি মূল্য দিতে হবে।
ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন দুর্বল করার উদ্দেশ্যে রাশিয়ার ‘হাইব্রিড হামলা’ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক এই প্রধান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশ্য সামরিক সংঘাতের বাইরে থাকা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় ইউরোপের উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন ক্যালাস। গ্রীষ্মকালে জার্মানির একটি বিমানবন্দরে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন পাওয়ার ঘটনা তিনি তুলে ধরেন। ওই ঘটনার জন্য বার্লিন মস্কোকে দায়ী করেছিল। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও গুরুত্ব দেন ক্যালাস। একই সঙ্গে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে প্রবেশকারী রুশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার প্রস্তাব দেন তিনি।
ক্যালাস বলেন, শেনজেন এলাকায় রুশ কূটনীতিকদের চলাচলের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সাবেক যোদ্ধাদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
রুশ নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইউরোপের ভূখণ্ডে হামলা চালাতে পারে—এমন ব্যক্তিদের পরিধি কমিয়ে আনতে হবে। তার বক্তব্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় ভিসা নীতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
রাশিয়ার অপতথ্য মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করার আহ্বানও জানান ক্যালাস। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, তথ্য ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানো হলে রাশিয়ার হাইব্রিড কর্মকাণ্ড শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার হতে পারে।
ইইউর পক্ষ থেকে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার আলোচনা চললেও পশ্চিমা দেশগুলোর কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, প্রকাশ্য যুদ্ধের বাইরে থাকা ‘ধূসর অঞ্চলে’ মস্কোর কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করা জটিল হয়ে উঠছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে তথ্যযুদ্ধ, সাইবার কার্যক্রম, গুপ্ত তৎপরতা ও অন্যান্য পরোক্ষ চাপের বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো উদ্বিগ্ন।
এদিকে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটেও রাশিয়ার হাইব্রিড কর্মকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করেছেন। সোমবার তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় ন্যাটোর হাতে বিভিন্ন ধরনের জবাব দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সব প্রতিক্রিয়া সব সময় প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হবে না বলেও জানান তিনি।
মার্ক রুটে আরও বলেন, ইউক্রেন যাতে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা পায়, সেটি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উত্তেজনা চলছে। যুদ্ধের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার বিভিন্ন পদক্ষেপও এই বিরোধের অংশ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ ক্যালাসের বক্তব্যে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের বিষয়টি সামনে এসেছে।