চীনসহ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা আরও জোরদারে চারটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। অগ্রাধিকারগুলো হলো—ওষুধ ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য, সুস্থ বার্ধক্য এবং টিকা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা।
বুধবার চীনের হাইকো শহরে অনুষ্ঠিত ‘বিএফএ গ্লোবাল হেলথ ফোরাম ২০২৬ হাইকো কনফারেন্সে’ দেওয়া বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব বিষয় তুলে ধরেন। বাসসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সম্ভাবনা এবং এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশের উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
চীনের বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ প্রবেশের সুযোগ আরও সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা এবং স্মার্ট স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহের কথা জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ওষুধ ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো একে অপরের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবে। বিশেষ করে ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় ও গবেষণার ক্ষেত্রে সহযোগিতা স্বাস্থ্য খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও গুরুত্বারোপ করেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং চিকিৎসা শিক্ষায় এআই ব্যবহারের সুযোগ দ্রুত বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে অনকোলজি বা ক্যানসার চিকিৎসা, প্রিসিশন মেডিসিন, রোবোটিক সার্জারি, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং দূরবর্তী রোগী পর্যবেক্ষণের মতো ক্ষেত্রগুলোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে রোগীসেবা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
এশিয়ায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে উল্লেখ করে সুস্থ বার্ধক্যকেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তার মতে, বয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
এ জন্য পুনর্বাসন সেবা, সহায়ক প্রযুক্তি, জেরিয়াট্রিক বা প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব বলেও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
চতুর্থ অগ্রাধিকার হিসেবে টিকা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি টিকা গবেষণা, উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এশিয়ার দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বিশ্বব্যাপী সংক্রামক রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় টিকার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এশিয়ার স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দেশগুলো ভবিষ্যতে কতটা কার্যকরভাবে সহযোগিতা, উদ্ভাবন এবং যৌথভাবে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারে তার ওপর। তাই স্বাস্থ্য খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে চীনের ১৪তম জাতীয় গণরাজনৈতিক পরামর্শ সম্মেলনের জাতীয় কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান এবং হংকং বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলের চতুর্থ প্রধান নির্বাহী লিয়াং চুন-ইং অংশ নেন। এ ছাড়া চীন, লাওস, মিশর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানো, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, ওষুধ ও টিকা উৎপাদন এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো সম্মেলনে গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উত্থাপিত চার অগ্রাধিকারের মধ্যে ওষুধ ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, এআই ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য, সুস্থ বার্ধক্য এবং টিকা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।