চীনের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যত চ্যালেঞ্জ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে কম খরচে এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে চীনের অগ্রগতি মার্কিন প্রযুক্তি খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা এগিয়ে থাকতে পারবে, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
চীনা এআই শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মার্কিন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের কেউ কেউ সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মধ্যে চীনের কাছে উন্নত প্রযুক্তির চিপ বিক্রির ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। গত বছর ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামে একটি উদ্যোগও নেয় যুক্তরাষ্ট্র। চীনকে বাদ দিয়ে এআই প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ২৩টি অঙ্গরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও এতে যুক্ত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন চীনা এআই মডেলের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের ভেতর থেকেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে দুই দেশের প্রতিযোগিতা শুধু এআই মডেল বা চিপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরবরাহব্যবস্থা, বাজার ও প্রযুক্তিনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
রফতানি নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রভাব
এআই উন্নয়নের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। চীনের অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলো এখনও উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, চিপ নকশার সফটওয়্যার এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির মতো বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
এই নির্ভরতার কারণে মার্কিন রফতানি নিয়ন্ত্রণ চীনের উন্নত এআই প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে। এতে চীনে এআই উন্নয়নের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে শুধু চিপের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে চীনের এআই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে থামিয়ে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এআই খাতে দক্ষ জনবল, বিনিয়োগ, বাজারের আকার, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং বিভিন্ন শিল্পে প্রযুক্তিটির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন বিধিনিষেধের জবাবে চীন নিজস্ব প্রযুক্তির বিকল্প তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এআই মডেলের স্থাপত্য উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান চিপের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও দেশটি গুরুত্ব দিচ্ছে।
মিত্রদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ
চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা সফল হবে, তা দেশটির মিত্রদের সহযোগিতার ওপরও নির্ভর করছে। কারণ উন্নত চিপ তৈরির পুরো সরবরাহব্যবস্থা কোনো এক দেশের হাতে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নকশা প্রযুক্তি, নেদারল্যান্ডস ও জাপানের চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং তাইওয়ানের উৎপাদন সক্ষমতা—সব মিলিয়েই বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
ফলে ওয়াশিংটন যদি রফতানি নিয়ন্ত্রণ অতিরিক্ত কঠোর করে বা ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন করে, তাহলে মিত্রদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নীতি নিয়ে বিরক্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগের প্রবণতাও বাড়তে পারে।
নেদারল্যান্ডসের চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোফ ফুকেও চীনের ওপর বিধিনিষেধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন প্রযুক্তি খাতেও মতভেদ
চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশল নিয়ে দেশটির প্রযুক্তি শিল্পের ভেতরেও ভিন্নমত রয়েছে। মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া চীনে চিপ রফতানির ওপর বিধিনিষেধের বিরোধিতা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এসব বিধিনিষেধকে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চীন এনভিডিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার হওয়ায় রফতানি নিয়ন্ত্রণের ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো বড় অঙ্কের ব্যবসা হারাচ্ছে—এমন দাবি করেছেন হুয়াং।
এদিকে চীনের ওপেন-সোর্স এআই মডেল নিয়েও মার্কিন প্রযুক্তি খাতে আলোচনা চলছে। চলতি বছর প্রায় ২০০টি মার্কিন স্টার্টআপ ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে চিঠি দিয়ে উন্নত চীনা এআই মডেলে প্রবেশাধিকার বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্টার্টআপগুলোর যুক্তি, চীনা কিছু এআই মডেল ওপেন-সোর্স হওয়ায় সেগুলো নিষিদ্ধ করা হলে ছোট মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে বাজার কয়েকটি বড় মার্কিন কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
রেয়ার আর্থে চীনের প্রভাব
এআই প্রতিযোগিতায় চীনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থের ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণ। আধুনিক চিপ, প্রযুক্তিপণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের রেয়ার আর্থ পৃথকীকরণ ও পরিশোধনের প্রায় ৯১ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। গত বছর বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ার পর চীন যুক্তরাষ্ট্রে ভারী রেয়ার আর্থ রফতানি সীমিত করেছিল। এর ফলে মার্কিন উৎপাদন খাতে চাপ তৈরি হয় এবং পরে সাময়িক সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রেয়ার আর্থের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোগ নিলেও দ্রুত চীনের বিকল্প তৈরি করা কঠিন। কারণ খনিজ উত্তোলনের পাশাপাশি তা পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এআই প্রতিযোগিতার প্রভাব
রেয়ার আর্থ শুধু এআই ও চিপ শিল্পেই ব্যবহৃত হয় না; বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতেও এসব খনিজ প্রয়োজন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ছে।
দুই দেশের অর্থনীতিকে পুরোপুরি আলাদা করার বা ‘ডিকাপলিং’ করার আলোচনা থাকলেও বাস্তবে তাদের অর্থনীতি এখনও গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। এই সম্পর্ক বোঝাতে দীর্ঘদিন ধরে ‘চিমেরিকা’ শব্দটিও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করবে—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। চিপ, এআই মডেল, বিরল খনিজ, দক্ষ জনবল, সরবরাহব্যবস্থা ও বৈশ্বিক বাজার—সবকিছুকে ঘিরেই দুই দেশের প্রতিযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। আগামী দিনে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও গভীর হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা