আদালতে অপ্রতিম হত্যার ৪ আসামির মধ্যে ৩ জনের স্বীকারোক্তি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর এক আসামি আদালতে কোনো স্বীকারোক্তি দেননি বলে জানিয়েছে পুলিশ। দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে নিজেদের বক্তব্য দেন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা আমলি আদালত-৬-এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবিদা সুলতানা মলির আদালতে এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তিন আসামিকে প্রায় ছয় ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) এবং মো. কামরুল হাসান ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া মো. সিয়াম (১৯) নামের অপর আসামি আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হননি।
পুলিশ জানিয়েছে, সিয়ামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে। তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ এবং ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে।
বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, অপ্রতিম শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছিল। বাসা থেকে বের হওয়ার পর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সে আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। তার মোবাইল ফোন বা অবস্থান সম্পর্কেও পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।
দীর্ঘ সময় অপ্রতিমের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে তার বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির পর অপ্রতিমকে খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়।
নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। একই সঙ্গে অপ্রতিমের বন্ধু ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হয়। তদন্তের একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিন আসামির জবানবন্দি
গ্রেপ্তারের পর চার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে তিন আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
আইন অনুযায়ী, কোনো আসামি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বেচ্ছায় দেওয়া বক্তব্য ১৬৪ ধারার জবানবন্দি হিসেবে রেকর্ড হতে পারে। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পাশাপাশি মামলার অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান আদালতে নিজেদের বক্তব্য দিয়েছেন। অপর আসামি মো. সিয়াম স্বীকারোক্তি না দেওয়ায় তাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
অপ্রতিম ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী
নিহত ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। অল্প বয়সে তার এমন মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও পরিচিতদের মধ্যে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তার বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। পরিবারের সদস্যরা অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তার সন্ধানের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালান। পরে তার মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোক নেমে আসে।
তদন্তে আরও তথ্য খুঁজছে পুলিশ
পুলিশ বলছে, মামলার তদন্ত এখনো চলমান। আদালতে তিন আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পাশাপাশি অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং প্রত্যেক আসামির ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপ্রতিম কীভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, ঘটনার পেছনে কী কারণ ছিল এবং এই ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আসামিদের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে তদন্তে পাওয়া তথ্যের মিল রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
অপর আসামি সিয়াম আদালতে স্বীকারোক্তি না দেওয়ায় তাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে পাওয়া সব তথ্য ও প্রমাণ পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার পর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির খবর প্রকাশের পর মামলাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বিস্তারিত বিষয়বস্তু পুলিশ এখনো প্রকাশ করেনি। তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপ হিসেবে আসামিদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।