নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩৭৫ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগ শুরুর ১০ দিন পরও নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৫৩১ জন। নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে মাউন্ট লাংটাং লিরুংয়ের উচ্চ ঢাল থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। পরে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত নেমে নেপালের ত্রিশূলী ও ভোতে কোশি নদীর অববাহিকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে কয়েক জায়গায় অস্থায়ী জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেগুলো ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
নেপালে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেখানে প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু এবং ৫১৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের ৪৯ জন ভারতীয়। তাঁদের অনেকেই কৈলাস-মানসসরোবরের তীর্থযাত্রী ছিলেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চীন-নেপাল সীমান্তের গিরং বন্দরে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্তবন্দর। পাঁচতলা চীনা কাস্টমস ভবন এবং প্রায় ২০ মিটার উঁচু সীমান্ত ফটকেরও কোনো চিহ্ন নেই। সেখানে উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি ও ভূগর্ভে অনুসন্ধানের রাডার ব্যবহার করে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও কাভ্রে জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু গ্রাম চাপা পড়েছে বা ভেসে গেছে। ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, স্কুল, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছে নেপালি কর্তৃপক্ষ।
দুর্যোগের পর নেপাল, চীন ও ভারত থেকে সেনা, পুলিশ ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল অভিযান চালাচ্ছে। হেলিকপ্টার, খননযন্ত্র ও অস্থায়ী সেতু ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে পাহাড়ধসের আশঙ্কা, বৃষ্টি ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যেও ১০ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ৬৪ বছর বয়সী চন্দিকা কুমারী শেরেস্তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে প্রায় ১০ দিন পর চীনা নাগরিক লু হাইতাওকেও জীবিত উদ্ধার করা হয়। এতে নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনেক মরদেহ চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আঙুলের ছাপ, শরীরের বিশেষ চিহ্ন এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নেপাল-চীনের মধ্যে দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় আরও জোরদার করা জরুরি।
সূত্র: রয়টার্স, আনাদোলু এজেন্সি, এপি নিউজ ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস