আইআরআই প্রতিনিধিদলকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সচেতন সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক
নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশ এবং গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার রয়েছে। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারও চরিত্রহনন বা গালিগালাজ গ্রহণযোগ্য নয়।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের দপ্তরে আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আইআরআইয়ের রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহার্টির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে বাংলাদেশের সাইবার অপরাধ, অনলাইন বুলিং প্রতিরোধ এবং প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসান বৈঠকের বিষয়গুলো সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, আইআরআই প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে সাইবার অপরাধ ও অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে।
আইআরআইয়ের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান, সংস্থাটির টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার রুকসানা হক এবং তরুণ রাজনীতিবিদ ও আইআরআই প্রশিক্ষণার্থী চামন ফারিয়া ও মোহাম্মদ প্রিন্স।
বৈঠকে আইআরআইয়ের রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহার্টি সংস্থাটির চলমান বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেন। বিশেষ করে তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ এবং সহিংসতামুক্ত রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আইআরআইয়ের কার্যক্রমের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
তিনি জানান, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের একটি অংশ বর্তমানে সাইবার বুলিং ও সংগঠিত অপপ্রচারের কারণে হয়রানি এবং মানহানির শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সর্বসম্মত নীতি ও আইনগত সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মত দেন।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইআরআই প্রতিনিধিদলকে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশ ও গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি গঠনমূলক সমালোচনা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরিত্রহনন বা গালিগালাজের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সাইবার বুলিং, অপপ্রচার ও ব্যক্তিগত হয়রানির বিরুদ্ধেও কার্যকর সুরক্ষা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের অনলাইনে হয়রানি থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
বৈঠকে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬ নিয়েও সরকারের চলমান কার্যক্রম তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, আইনটির খসড়া পরিমার্জনের ক্ষেত্রে গত দুই মাস ধরে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, জ্যেষ্ঠ সম্পাদক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাদের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে আইনটি আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা চলছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবিত আইনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ডিজিটাল স্পেসে শালীন পরিবেশ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নারী ও তরুণদের সাইবার বুলিং থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আইনের উদ্দেশ্যের মধ্যে থাকবে।
তবে কোনো আইন যেন সাংবাদিকতা বা বৈধ মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি না করে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার বক্তব্যে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে সহিংসতামুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আরও সুসংহত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের ইতিবাচক পরামর্শ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধ ও হয়রানি ঠেকানোও সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ, রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খানসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইআরআই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বৈঠকে একদিকে যেমন নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, অন্যদিকে অনলাইন বুলিং, সাইবার অপরাধ ও সংগঠিত অপপ্রচার মোকাবিলায় কার্যকর আইনগত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬ চূড়ান্ত করার আগে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে, বৈঠকে তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।