বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
পাবনা গণপূর্ত বিভাগকে ঘিরে সরকারি অর্থ ব্যয়ে বড় ধরনের অনিয়ম, নথি জালিয়াতি, কাজের অগ্রগতি ছাড়াই বিল পরিশোধ এবং সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণকাজে চুক্তিবহির্ভূত উপকরণ ব্যবহার, অস্তিত্বহীন কাচের কাজের বিপরীতে প্রায় ৫ কোটি টাকা বিল, ২৭ কোটি টাকার ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ এবং প্যাকেজ বিভাজনের নথিতে সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ।
অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাকাটায় প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের তথ্য সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কাচের কাজ না থাকলেও প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল
পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০ তলা মূল ভবনের ‘এ’ ব্লকের সংলগ্ন খোলা ছাদে কাচের কাজ ও গ্লাস টাওয়ার নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, ১২১৭৬৫০ দরপত্র রেফারেন্সের আওতায় কাজটি পায় এসএ এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগ, বাস্তবে কাজের দৃশ্যমান অস্তিত্ব না থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত বিল হিসেবে ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
তখন ভবনের নবম তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দশম তলার ওপরে কাচের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল পরিশোধের অভিযোগটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে—কাজের বাস্তব অগ্রগতি যদি না থাকে, তাহলে পরিদর্শন, পরিমাপ, বিল যাচাই ও অনুমোদনের একাধিক ধাপ পেরিয়ে এত বড় অঙ্কের অর্থ কীভাবে ছাড় হলো?
পাথরের বদলে ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ
একই প্রকল্পের লোড-বিয়ারিং কলাম ও বেইজমেন্ট নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত গ্রেডের স্টোন চিপস ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
এতে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও প্রশ্নের মুখে।
২৭ কোটি টাকার ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’
মূল কাজ শেষ হওয়ার আগেই ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ দেখিয়ে পৃথক দরপত্র আহ্বানের অভিযোগও রয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি ছয়টি গ্রুপে মোট ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে কাজগুলো বিভক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে পিপিআর অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অনুস্বাক্ষর যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জাল?
ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো প্যাকেজ বিভাজনের অনুমোদনসংক্রান্ত নথিতে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ।
প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় দপ্তরে অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট মূল নথির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শামীম আখতারও সংশ্লিষ্ট নথিতে থাকা স্বাক্ষর তাঁর নয় বলে জানিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি প্রশাসনিক অনিয়মের পাশাপাশি ফৌজদারি তদন্তের আওতায় পড়তে পারে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পাবনাসহ পাঁচটি মেডিকেল কলেজের দরপত্রসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে বলেও তথ্য রয়েছে।
রূপপুর গ্রিন সিটিতে ১৮৬ কোটি টাকার প্রশ্ন
রূপপুর গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পে বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন সরঞ্জাম ও ব্যাকআপ জেনারেটর কেনাকাটার হিসাবেও বড় ধরনের অসংগতির অভিযোগ রয়েছে।
সিএজি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের সরকারি রেট শিডিউলভিত্তিক প্রাক্কলিত মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
নিরীক্ষায় ‘আনব্যালেন্সড বিডিং’-এর বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু সাধারণ পণ্যের দর কম দেখিয়ে মোট দরকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সাবস্টেশন সরঞ্জাম, ট্রান্সফরমার ও জেনারেটরের একক মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল।
পাঁচ আইটেমেই প্রায় ১৮ কোটি টাকার ব্যবধান
গ্রিন সিটির ৭ নম্বর ভবনের হিসাবেও বড় ব্যবধান দেখা যায় বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
HV Switchgear-এর সরকারি মূল্য প্রায় ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা হলেও বিল হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। Distribution Transformer-এর সরকারি মূল্য প্রায় ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিপরীতে বিল হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া LV Switchgear, PFC Panel ও দুটি ডিজেল জেনারেটর মিলিয়ে পাঁচটি আইটেমে সরকারি দর ও বিলের মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ব্যবধানের কথা বলা হয়েছে।
তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের তথ্য সিএজি প্রতিবেদনে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, সাজিন এন্টারপ্রাইজ এবং এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগকে দেওয়া অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা।
সিএজি সংশ্লিষ্ট দরপত্র ও বিল পরিশোধকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করেছে বলে তথ্য রয়েছে।
অভিযোগকারী ঠিকাদারকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
গণপূর্তের কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ করায় স্থানীয় ঠিকাদার মিনহাজ উদ্দিনকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ এবং গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়।
পরে গণপূর্ত কার্যালয়ে এনে অভিযোগ প্রত্যাহারের মুচলেকায় স্বাক্ষর করানো এবং ভিডিও ধারণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে এটি দুর্নীতির বাইরেও নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
সম্পদ নিয়েও অভিযোগ
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবীরের সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার উত্তরায় ফ্ল্যাট, স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ, পাবনার ভাঙ্গুড়ায় কৃষিজমি ও বাণিজ্যিক প্লট এবং পাবনা শহরে বাড়ি থাকার দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য ও আয়ের উৎস সম্পর্কে সরকারি নথি যাচাই ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ জন্য সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব ও জমির দলিল যাচাই প্রয়োজন।
জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?
অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পূর্ণাঙ্গ লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কাচের কাজের বিলকে ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন বলে দাবি করা হলেও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি।
সব মিলিয়ে পাবনা গণপূর্ত বিভাগকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, প্রকৌশল তদারকি, নথির নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত, প্রকল্পের নথি ও বিলের ফরেনসিক যাচাই, কাজের বাস্তব পরিমাপ, বাজারদর যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-ঠিকাদারদের আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্তদের বক্তব্য ও প্রমাণও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
কারণ মূল প্রশ্ন একটাই—সরকারি প্রকল্পে কাজের বাস্তব অগ্রগতি, বিল যাচাই এবং অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ যদি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে এত বড় অঙ্কের আর্থিক অসংগতির অভিযোগ উঠল কীভাবে?