পুতিনের আমন্ত্রণ গ্রহণ, মস্কো সফরে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মস্কো সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২৪তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।
শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের জন্য পারস্পরিকভাবে সুবিধাজনক সময়ে নরেন্দ্র মোদির রাশিয়া সফরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
নরেন্দ্র মোদির এই সফর ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের মতো খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
এর আগে তিন দিনের সফরে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে শুক্রবার ভারতে পৌঁছান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন খাতে অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে প্রতিরক্ষা খাতের পাশাপাশি জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং সার সরবরাহের মতো কৌশলগত খাতেও সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করার জন্য বিদ্যমান সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে নেতারা গুরুত্বারোপ করেন।
ভারত-রাশিয়া বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং চলমান শান্তি উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অবহিত করেন।
জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সংঘাত নিরসনে তার দেশের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইউক্রেন সংকটের টেকসই সমাধান যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং সংলাপ ও গঠনমূলক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
ভারত শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যেও সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা গেছে।
এর আগে কাজাখস্তানের আস্তানায় সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ওই বৈঠকেও ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় সংঘাত দ্রুত বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে রুশ প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধের অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে দুই দেশই নিজেদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে জ্বালানি খাতে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, সার ও বিভিন্ন কৌশলগত পণ্যের সরবরাহও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এদিকে ২৪তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য মস্কো সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের কর্মকর্তারা সফরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সফরের তারিখ, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য চুক্তি বা সমঝোতার বিষয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত জানানো হতে পারে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, দুই পক্ষের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সফরের জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা হবে। ফলে মোদির মস্কো সফরের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
নরেন্দ্র মোদির এই সফর অনুষ্ঠিত হলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য বাস্তবায়ন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ইউক্রেন সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ও সহযোগিতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সব মিলিয়ে পুতিনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে নরেন্দ্র মোদির মস্কো সফরের সিদ্ধান্ত ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনে অর্থনীতি ও কৌশলগত সহযোগিতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।